প্রসবের ভয়ে হাসপাতাল থেকে পালিয়েছিলেন, ৩৬ বছর পর পেট থেকে মিলল ‘পাথর শিশু’

গর্ভধারণের পর সন্তান জন্ম না নিয়ে মৃত ভ্রূণ বছরের পর বছর মায়ের শরীরে থেকে যাওয়ার ঘটনা চিকিৎসাবিজ্ঞানে অত্যন্ত বিরল। এমন অবস্থাকে বলা হয় ‘লিথোপেডিয়ন’ (Lithopedion), যা সাধারণভাবে ‘পাথর শিশু’ নামে পরিচিত। দীর্ঘদিন শরীরে থাকা মৃত ভ্রূণকে ঘিরে ধীরে ধীরে ক্যালসিয়াম জমে সেটি শক্ত হয়ে পাথরের মতো রূপ নিতে পারে।

চিকিৎসাবিজ্ঞানের একটি গবেষণায় ভারতের নাগপুরের ৬০ বছর বয়সী এক নারীর এমনই বিরল ঘটনার কথা উঠে এসেছে। ২০১৪ সালে তলপেটে ব্যথা এবং শক্ত একটি পিণ্ড নিয়ে তিনি হাসপাতালে ভর্তি হন। প্রায় দুই মাস ধরে তিনি এই সমস্যায় ভুগছিলেন। শুরুতে চিকিৎসকেরা পেটের পিণ্ডটিকে টিউমার বলে ধারণা করেছিলেন।

তবে তার পুরোনো চিকিৎসা-ইতিহাস পর্যালোচনা করার পর বিষয়টি অন্যদিকে মোড় নেয়। জানা যায়, ১৯৭৮ সালে ওই নারী শেষবার গর্ভবতী হয়েছিলেন। তখন চিকিৎসকেরা তাকে জানিয়েছিলেন, গর্ভের সন্তানটি মারা গেছে এবং অস্ত্রোপচারের মাধ্যমে তা অপসারণের পরামর্শ দিয়েছিলেন। কিন্তু অস্ত্রোপচারের ভয় থাকায় তিনি চিকিৎসা না নিয়ে নিজ গ্রামে ফিরে যান।

এরপর দীর্ঘ সময় তিনি আর হাসপাতালে যাননি। মাঝেমধ্যে পেটে ব্যথা হলেও স্থানীয় চিকিৎসকের কাছ থেকে ওষুধ নিয়ে তা নিয়ন্ত্রণ করতেন। এভাবে প্রায় ৩৬ বছর কেটে যায়। ২০১৪ সালে তলপেটে ব্যথার পাশাপাশি শক্ত পিণ্ড অনুভূত হলে তিনি হাসপাতালে চিকিৎসা নিতে আসেন।

পরীক্ষা-নিরীক্ষায় দেখা যায়, জরায়ুর পেছনে প্রায় ১১ × ৮ × ৮ সেন্টিমিটার আকারের একটি শক্ত পিণ্ড রয়েছে। পিণ্ডটির ভেতরে হাড়ের মতো কাঠামোও দেখা যায়। চিকিৎসকদের সন্দেহ হয়, এটি সম্ভবত বহু বছর আগে মারা যাওয়া ভ্রূণের অবশিষ্টাংশ।

পিণ্ডটির কারণে দুই পাশের মূত্রনালিতেও চাপ সৃষ্টি হয়েছিল। ফলে কিডনিতে প্রস্রাব জমে যাওয়ার লক্ষণ দেখা যায়। পরে অস্ত্রোপচারের মাধ্যমে পিণ্ডটি বের করে আনা হয়। চিকিৎসকেরা দেখতে পান, শক্ত একটি আবরণের মধ্যে ভ্রূণের হাড় রয়েছে। পরীক্ষাগারে বিশ্লেষণের পর নিশ্চিত হওয়া যায়, এটি একটি লিথোপেডিয়ন।

কীভাবে তৈরি হয় ‘পাথর শিশু’?

লিথোপেডিয়ন সাধারণত জরায়ুর বাইরে গর্ভধারণের একটি বিরল পরিণতি। বিশেষ করে পেটের ভেতরে ভ্রূণ অবস্থান করার পর সেটি মারা গেলে এবং মায়ের শরীর সেটিকে স্বাভাবিকভাবে শোষণ করতে না পারলে এই পরিস্থিতি তৈরি হতে পারে।

মৃত ভ্রূণটি যদি শরীরের পক্ষে শোষণ করা কঠিন হয়, তাহলে সংক্রমণ বা অন্যান্য ক্ষতি ঠেকাতে শরীর সেটিকে একটি আবরণের মধ্যে আটকে রাখে। সময়ের সঙ্গে ওই আবরণে ক্যালসিয়াম জমতে থাকে। ধীরে ধীরে ভ্রূণটি শক্ত হয়ে পাথরের মতো রূপ নেয়।

এ ধরনের ঘটনা এতটাই বিরল যে বিশ্বজুড়ে এর মাত্র কয়েকশ ঘটনা চিকিৎসাবিজ্ঞানে নথিভুক্ত হয়েছে বলে বিভিন্ন প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। কখনো পুরো ভ্রূণই ক্যালসিয়ামের স্তরে আবৃত হয়ে যায়, আবার কখনো নরম টিস্যু নষ্ট হয়ে শুধু হাড় বা কঙ্কালের অংশ অবশিষ্ট থাকে।

কয়েক দশক পরেও ধরা পড়তে পারে

লিথোপেডিয়নের আরেকটি বিস্ময়কর দিক হলো, এটি বহু বছর এমনকি কয়েক দশক পর্যন্ত শরীরে থাকতে পারে। অনেক রোগীর ক্ষেত্রে দীর্ঘদিন কোনো স্পষ্ট উপসর্গও দেখা যায় না। পরবর্তীতে পেটে ব্যথা, শক্ত পিণ্ড বা অন্য কোনো শারীরিক সমস্যার কারণে পরীক্ষা করতে গিয়ে এটি শনাক্ত হয়।

মরক্কোর জাহরা আবুতালিবের ঘটনাটিও এ ক্ষেত্রে উল্লেখযোগ্য। ১৯৫৫ সালে সন্তান প্রসবের সময় জটিলতার পর তিনি হাসপাতাল থেকে বাড়ি ফিরে যান। পরে তার প্রসববেদনা বন্ধ হয়ে গেলেও সন্তান জন্ম নেয়নি। প্রায় ৪৬ বছর পর, ৭৫ বছর বয়সে তীব্র পেটব্যথা নিয়ে চিকিৎসকের কাছে গেলে পরীক্ষায় তার শরীরে দীর্ঘদিন ধরে থাকা মৃত ভ্রূণের সন্ধান পাওয়া যায়। পরে অস্ত্রোপচারের মাধ্যমে সেটি অপসারণ করা হয়।

বিরল হলেও হতে পারে জটিলতা

পেটের ভেতরে দীর্ঘদিন ধরে থাকা কোনো শক্ত পিণ্ডকে সবসময় টিউমার ধরে নেওয়া ঠিক নয়। রোগীর আগের গর্ভধারণের ইতিহাস, শারীরিক পরীক্ষা এবং বিভিন্ন চিত্রায়ন পরীক্ষার মাধ্যমে এর প্রকৃত কারণ শনাক্ত করা সম্ভব।

লিথোপেডিয়ন অনেক সময় কোনো উপসর্গ ছাড়াই শরীরে অবস্থান করতে পারে। তবে এটি আশপাশের অঙ্গের ওপর চাপ সৃষ্টি করলে পেটে ব্যথা, মূত্রনালিতে বাধা কিংবা কিডনিতে প্রস্রাব জমে যাওয়ার মতো জটিলতা দেখা দিতে পারে।

চিকিৎসাবিজ্ঞানে ‘পাথর শিশু’ নামে পরিচিত এই ঘটনা মানবদেহের প্রতিরোধব্যবস্থার একটি অত্যন্ত বিরল ও বিস্ময়কর উদাহরণ। একই সঙ্গে এটি জরায়ুর বাইরে গর্ভধারণের সম্ভাব্য জটিলতা এবং দীর্ঘদিন চিকিৎসার বাইরে থাকা অবস্থার গুরুত্বও তুলে ধরে।