বরগুনা আমতলী পৌরসভার কেন্দ্রীয় লেকের সৌন্দর্যবর্ধন প্রকল্পের কাজে অনিয়ম ও নিম্নমানের নির্মাণসামগ্রী ব্যবহারের অভিযোগ উঠেছে। এরই মধ্যে নির্মাণাধীন ওয়াকওয়ের একটি ড্রপওয়াল ধসে পড়ায় প্রকল্পের কাজের মান নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন স্থানীয়রা।
রোববার সকালে শ্রমিকরা লেকের ওয়াকওয়ের নির্মাণকাজ করার সময় ড্রপওয়ালের একটি অংশ ধসে পড়ে। খবর পেয়ে স্থানীয়রা ঘটনাস্থলে জড়ো হলে ঠিকাদারের লোকজন ধসে যাওয়া অংশটি পলিথিন দিয়ে ঢেকে দেন বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে।
স্থানীয়দের অভিযোগ, নিম্নমানের নির্মাণসামগ্রী ব্যবহার ও যথাযথভাবে নির্মাণকাজ না করার কারণেই ড্রপওয়ালটি ধসে পড়েছে। তারা দ্রুত তদন্ত করে অনিয়মের সঙ্গে জড়িতদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন।
জানা গেছে, বিশ্বব্যাংকের অর্থায়নে স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ের এলজিসিআরআরপি প্রকল্পের আওতায় ২০২৩-২৪ অর্থবছরে আমতলী পৌরসভার কেন্দ্রীয় লেকের সৌন্দর্যবর্ধনের জন্য ১২ কোটি ৫৬ লাখ ৯৮ হাজার ৩২৩ টাকা ব্যয়ে প্রকল্পটি গ্রহণ করা হয়।
অভিযোগ রয়েছে, ২০২৪ সালের এপ্রিল মাসে তৎকালীন আমতলী পৌর মেয়র মো. মতিয়ার রহমান গোপনে প্রকল্পটির দরপত্র আহ্বান করেন। পরে ঝালকাঠির ‘ইসলাম ব্রাদার্স’ নামের একটি ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানকে কাজটি দেওয়া হয়। তবে প্রতিষ্ঠানটির মালিকের দাবি, তারা শুধু লাইসেন্স দিয়েছেন; প্রকল্পের মূল কাজ সাবেক মেয়র মতিয়ার রহমানই করেছেন।
প্রকল্প-সংশ্লিষ্টদের অভিযোগ, ২০২৪ সালের ৩০ জুলাই কাজ শুরুর কথা থাকলেও নির্ধারিত সময়ে কাজ শুরু হয়নি। পরবর্তীতে ২০২৪ সালের ২৫ অক্টোবর তৎকালীন আমতলী উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মুহাম্মদ আশরাফুল আলম প্রকল্পটির উদ্বোধন করেন। কাজ শুরুর পর প্রকল্পের ব্যয় নিয়ে প্রশ্ন ওঠে এবং ব্যয় কমিয়ে আনার উদ্যোগ নেওয়া হয় বলে সংশ্লিষ্টরা জানান। এরপর ঠিকাদার কাজ বন্ধ করে দেন বলেও অভিযোগ রয়েছে।
স্থানীয়দের আরও অভিযোগ, কাজ শুরুর পর থেকেই নিম্নমানের নির্মাণসামগ্রী ব্যবহার করা হচ্ছিল। বিষয়টি নিয়ে একাধিকবার সংশ্লিষ্ট প্রশাসনকে জানানো হলেও কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি।
এদিকে প্রকল্পের কাজ তদারকিতে থাকা কর্মকর্তাদের সঙ্গে ঠিকাদারের ঘনিষ্ঠতার অভিযোগও করেছেন স্থানীয়রা। তবে এসব অভিযোগের বিষয়ে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
রোববার ওয়াকওয়ের ড্রপওয়াল ধসে পড়ার খবর পেয়ে সাংবাদিকরা ঘটনাস্থলে গিয়ে ছবি ও তথ্য সংগ্রহের চেষ্টা করেন। এ সময় ঠিকাদারের ম্যানেজার শ্যামল চন্দ্র, ব্যক্তিগত সহকারী পান্নু মোল্লা ও তাদের সহযোগীরা সাংবাদিকদের ছবি তুলতে বাধা দেন এবং অসৌজন্যমূলক আচরণ করেন বলে অভিযোগ করেছেন সাংবাদিক নাসরিন শিপু, রিমন ও রাসেল।
স্থানীয় বাসিন্দা শাহীন, নুরুল ইসলাম ও সাইদুজ্জামান বলেন, “কাজের শুরু থেকেই নিম্নমানের নির্মাণসামগ্রী ব্যবহারের অভিযোগ রয়েছে। বিষয়টি নিয়ে কয়েকবার প্রশাসনকে জানানো হয়েছে। এখন নির্মাণাধীন অবস্থায় ওয়াকওয়ের ড্রপওয়াল ধসে পড়ায় অভিযোগের সত্যতা নিয়ে প্রশ্ন তৈরি হয়েছে। আমরা দ্রুত তদন্ত করে দায়ীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা চাই।
তবে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান ইসলাম ব্রাদার্সের মালিক মো. খাইরুল আজাদ বলেন, “লাইসেন্স দিয়েছি, এটা সত্য। কিন্তু কাজ করেন সাবেক মেয়র মতিয়ার রহমান। সেখানে আমার কিছুই নেই। আমি এ বিষয়ে কিছু জানি না।
অভিযোগের বিষয়ে আমতলী উপজেলা নিষিদ্ধ ঘোষিত আওয়ামী লীগের সভাপতি ও সাবেক পৌর মেয়র মো. মতিয়ার রহমানের মুঠোফোনে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তাকে পাওয়া যায়নি।
আমতলী পৌরসভার নির্বাহী প্রকৌশলী মো. মশিউর রহমান ওয়াকওয়ের ড্রপওয়াল ধসে পড়ার বিষয়টি স্বীকার করে বলেন, “মূল পিলার বা পাইলিংয়ে কোনো সমস্যা হয়নি। সেন্টারিংয়ের কাঠ বা সাপোর্ট খুলে যাওয়ার কারণে ঢালাইয়ের অংশটি কিছুটা ধসে পড়েছে। যে অংশটিতে সমস্যা হয়েছে, সেটির কাজ আপাতত বন্ধ রাখা হয়েছে।
আমতলী উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ভারপ্রাপ্ত) মো. আশরাফুল ইসলাম বলেন, “বিষয়টি খোঁজখবর নিয়ে দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
স্থানীয়দের দাবি, বিপুল অর্থের এই প্রকল্পে নির্মাণকাজের মান যাচাই, ব্যবহৃত সামগ্রীর গুণগত মান পরীক্ষা এবং প্রকল্পের অর্থ ব্যয়ের বিষয়ে নিরপেক্ষ তদন্ত করা হোক। একই সঙ্গে অনিয়মের প্রমাণ পাওয়া গেলে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন তারা।
