স্মার্টফোন এখন শুধু যোগাযোগের মাধ্যম নয়, বরং কাজ, বিনোদন, সামাজিক যোগাযোগের সঙ্গী। ফলে ঘাড় ঝুঁকিয়ে ঘণ্টার পর ঘণ্টা ফোন দেখার অভ্যাসও প্রায় সব বয়সের মানুষের মধ্যে তৈরি হয়েছে। বিছানায় শুয়ে, একপাশ ফিরে কিংবা ঘাড় একদিকে কাত করে মোবাইল দেখার এই অভ্যাস ধীরে ধীরে ঘাড়, কাঁধ ও মেরুদণ্ডে অতিরিক্ত চাপ তৈরি করতে পারে। শুরুতে সামান্য ব্যথা বা অস্বস্তি মনে হলেও দীর্ঘদিনের ভুল ভঙ্গি গুরুতর শারীরিক সমস্যার কারণ হতে পারে।
সম্প্রতি ভারতীয় ৫২ বছর বয়সি অভিনেত্রী শাকিলার শুয়ে-বসে দীর্ঘ সময় স্মার্টফোন দেখার অভ্যাস থেকে ঘাড় ও শরীরের ভঙ্গিতে গুরুতর পরিবর্তন দেখা দেয় বলে জানা গেছে। প্রতিদিন ঘণ্টার পর ঘণ্টা বিছানায় শুয়ে, কখনো একপাশ ফিরে আবার কখনো ঘাড় একদিকে কাত করে মোবাইল দেখতেন তিনি। চা বা কফি খাওয়ার সময়টুকু বাদ দিলে প্রায় সারাক্ষণই ফোনে চোখ থাকত।
দিনের পর দিন একই ভঙ্গিতে ফোন ব্যবহারের পর ঘাড় ও মেরুদণ্ডে তীব্র ব্যথা শুরু হয়। পরিস্থিতি এমন পর্যায়ে পৌঁছায় যে হাসপাতালে চিকিৎসা নিতে হয়। ঘাড় সোজা রাখতে নেক কলার ব্যবহার করেও সমস্যার পুরোপুরি সমাধান হয়নি। শেষ পর্যন্ত অস্ত্রোপচার করে টাইটানিয়ামের প্লেট বসানোর প্রয়োজন হয় বলে জানা গেছে। চিকিৎসার খরচও প্রায় ৩ লাখ টাকা হয়েছে বলে উল্লেখ করা হয়েছে।
স্মার্টফোনের স্ক্রিন যত নিচে, ঘাড়ের ওপর চাপ তত বেশি হতে পারে
‘টেক্সট নেক’ কী?
ঘাড় নিচু করে স্মার্টফোন দেখার ফলে ঘাড় ও কাঁধের ওপর যে অতিরিক্ত চাপ তৈরি হয়, তাকে সাধারণভাবে ‘টেক্সট নেক’ বলা হয়। দীর্ঘ সময় মাথা সামনের দিকে ঝুঁকিয়ে রাখলে ঘাড়ের পেশি ও মেরুদণ্ডকে স্বাভাবিক অবস্থার তুলনায় বেশি ভার বহন করতে হয়।
শুরুতে ঘাড়ে ব্যথা, কাঁধ শক্ত হয়ে যাওয়া, মাথাব্যথা কিংবা দীর্ঘক্ষণ একই ভঙ্গিতে থাকার পর অস্বস্তির মতো উপসর্গ দেখা দিতে পারে। নিয়মিত ভুল ভঙ্গিতে মোবাইল ব্যবহারের অভ্যাস চলতে থাকলে সমস্যা আরও জটিল হতে পারে।
শুধু ঘাড় নয়, প্রভাব পড়তে পারে মেরুদণ্ডেও
বাস, ট্রেন, মেট্রো কিংবা বাড়ির সোফা- প্রায় সর্বত্রই এখন দেখা যায় ঘাড় নিচু করে ফোন দেখার দৃশ্য। হাঁটার সময়ও অনেকে ফোনের দিকে তাকিয়ে থাকেন। এর ফলে শরীরের স্বাভাবিক ভঙ্গি বদলে যেতে পারে।
দীর্ঘদিন ধরে শরীরের ওপর অসম চাপ পড়লে মেরুদণ্ডের স্বাভাবিক বাঁকেও পরিবর্তন আসতে পারে। কাইফোসিস বা স্কোলিওসিসের মতো মেরুদণ্ডের বক্রতার সমস্যা থাকলে পরিস্থিতি আরও জটিল হতে পারে। তবে ফোন ব্যবহারের ভঙ্গিই যে সরাসরি কাইফোস্কোলিয়োসিসের কারণ- এমন সিদ্ধান্ত ব্যক্তিভেদে চিকিৎসকের মূল্যায়ন ছাড়া দেওয়া যায় না।
৬০ ডিগ্রি ঝোঁকা ভঙ্গিও বিপজ্জনক
স্মার্টফোন ব্যবহারের সময় মাথা অনেকটা সামনের দিকে ঝুঁকে গেলে ঘাড়ের ওপর চাপ উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়ে যায়। প্রচলিত গবেষণায় মাথা প্রায় ৬০ ডিগ্রি সামনে ঝুঁকলে ঘাড়ের ওপর কয়েক গুণ বেশি যান্ত্রিক চাপ পড়ার কথা বলা হয়েছে।
এই অতিরিক্ত চাপ দীর্ঘ সময় ধরে চললে ঘাড় ও কাঁধের পেশিতে টান তৈরি হতে পারে। ফলে ব্যথা, শক্ত হয়ে যাওয়া এবং নড়াচড়ায় অস্বস্তি দেখা দিতে পারে। সবচেয়ে বড় সমস্যা হলো,ফোন ব্যবহারের সময় এই চাপ অনুভব না হলেও দীর্ঘমেয়াদে তার প্রভাব দেখা দিতে পারে।
বিছানায় শুয়ে মোবাইল দেখার অভ্যাস বদলানো
বিছানায় কাত হয়ে বা উপুড় হয়ে মোবাইল দেখার অভ্যাস শরীরের স্বাভাবিক অ্যালাইনমেন্ট নষ্ট করতে পারে। তাই স্মার্টফোন ব্যবহারের সময় ঘাড় যতটা সম্ভব সোজা রাখা এবং ফোনটিকে চোখের কাছাকাছি উচ্চতায় তুলে ধরার চেষ্টা করা ভালো।
একটানা দীর্ঘ সময় ফোনের দিকে তাকিয়ে না থেকে মাঝেমধ্যে বিরতি নেওয়াও জরুরি। উঠে একটু হাঁটা, কাঁধ ও ঘাড় স্বাভাবিকভাবে নাড়ানো এবং শরীরের ভঙ্গি বদলানো অভ্যাস করুন।
ব্যথা হলে অবহেলা নয়
ঘাড়ে সামান্য ব্যথা হলেই আতঙ্কিত হওয়ার প্রয়োজন নেই। কিন্তু দীর্ঘদিন ব্যথা থাকা, হাত-পায়ে ঝিনঝিনি বা দুর্বলতা, অসাড়তা, ভারসাম্যের সমস্যা কিংবা নড়াচড়ায় গুরুতর অসুবিধা হলে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া জরুরি।
ফোন আমাদের দৈনন্দিন জীবনের প্রয়োজনীয় অংশ। তাই ফোন ব্যবহার পুরোপুরি বন্ধ করার চেয়ে কীভাবে ব্যবহার করছি, কতক্ষণ ব্যবহার করছি এবং শরীরের ভঙ্গি কেমন রাখছি, সেদিকে নজর দেওয়াই বেশি গুরুত্বপূর্ণ। এখন থেকেই অভ্যাস বদলালে ঘাড় ও মেরুদণ্ডের ওপর অপ্রয়োজনীয় চাপ অনেকটাই কমানো সম্ভব।
সূত্র: টাইমস অব ইন্ডিয়া
