৪ যুগ্মসচিব, ৩ উপসচিব ও ২ সিনিয়র সহকারী সচিবের কম্পিউটারের র‌্যাম-হার্ডডিস্ক চুরি

শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা বিভাগ থেকে অন্তত ২২টি কম্পিউটারের যন্ত্রাংশ চুরির ঘটনায় শিক্ষা প্রশাসনে ব্যাপক তোলপাড় সৃষ্টি হয়েছে। মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা বিভাগে গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করা চারজন যুগ্মসচিব, তিনজন উপসচিব এবং দুইজন সিনিয়র সহকারী সচিবের কক্ষের কম্পিউটারের যন্ত্রাংশ চুরি হয়েছে। এর বাইরে একজন প্রশাসনিক কর্মকর্তা, তিনজন ব্যক্তিগত কর্মকর্তা, অফিস সহকারী কাম কম্পিউটার মুদ্রাক্ষরিক এবং বিভাগের সভাকক্ষের কম্পিউটার থেকেও যন্ত্রাংশ চুরি হয়েছে।

চুরি হওয়া যন্ত্রাংশগুলোর মধ্যে অধিকাংশ প্রসেসর ও র‌্যাম। এছাড়া একজন যুগ্মসিচবের কম্পিউটার থেকে হার্ডডিস্ক চুরির ঘটনাও ঘটেছে। এসব যন্ত্রাংশ চুরির ফলে দাপ্তরিক কাজে স্থবিরতা দেখা দিয়েছে। যদিও শিক্ষা মন্ত্রণালয় বলছে, কাজে গতি আনতে শিগগিরই কম্পিউটারগুলোতে নতুন যন্ত্রাংশ লাগানো হবে।

মন্ত্রণালয় সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, গত কয়েকদিন ধরে মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা বিভাগের বিভিন্ন শাখার কম্পিউটার চালু হচ্ছিল না। পরবর্তীতে বিভাগের আইসিটি শাখা সেগুলো পরীক্ষা করে। এতে ২২টি ডেস্কটপ কম্পিউটারের ভেতরে প্রসেসর ও র‌্যাম নেই বলে জানতে পারেন তারা। কয়েকটি কম্পিউটার থেকে হার্ডডিস্কও খুলে নেওয়া হয়। পরবর্তীতে তারা সিসিটিভি ফুটেজ বিশ্লেষণ শুরু করেন।

নীতি ও সংস্কার অধিশাখার যুগ্মসচিব খোদেজা খাতুন (কক্ষ-১৭১৩), বিশ্ববিদ্যালয় অধিশাখার যুগ্মসচিব শারমিনা নাসরীন (কক্ষ-১৭০৩) ও কলেজ-২ অধিশাখার যুগ্মসচিব রোখছানা বেগমের (কক্ষ-১৭২৫) রুম থেকে ASUS Expert Center D700 কম্পিউটার থেকে প্রসেসর ও র‍্যাম খুলে নেওয়া হয়েছে। অন্যদিকে প্রশাসন অধিশাখার যুগ্মসচিব তরফদার মো. আক্তার জামিল (কক্ষ-১৭০১)-এর HP Pro 290 G9 কম্পিউটার থেকে একসঙ্গে প্রসেসর, র‍্যাম ও হার্ডডিস্ক খুলে নেওয়া হয়েছে। 

বেশ কয়েকদিনের সিসিটিভি ফুটেজ বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, গণপূর্ত অধিদপ্তরের অফিস সহায়ক মো. মাহবুব হোসেন অফিস ছুটি শেষে সন্ধ্যা ৬টার পর বিভিন্ন কক্ষে প্রবেশ করে ৫ থেকে ৮ মিনিট অবস্থান করেন। তিনি যেসব কক্ষে প্রবেশ করেছেন, সেসব কক্ষের অধিকাংশ কম্পিউটার থেকেই পরে যন্ত্রাংশ পাওয়া যায়নি।

গত ১৪ জুন মন্ত্রণালয়ের সভাকক্ষের সন্ধ্যা ৬টা ১৫ মিনিটের সিসিটিভি ফুটেজে দেখা যায়, এক ব্যক্তি একটি ডেস্কটপ কম্পিউটার কার্টন দিয়ে ঢেকে পাশের খাবার পরিবেশন কক্ষে নিয়ে যান এবং প্রায় ছয় মিনিট পর আবার সেটি আগের স্থানে রেখে যান। পরে ওই কম্পিউটার পরীক্ষা করে এর প্রসেসর ও র‍্যাম পাওয়া যায়নি বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

এ ঘটনায় প্রশাসনিক কর্মকর্তা মো. আব্দুর রহিম শাহবাগ থানায় দায়ের করা অভিযোগে দাবি করেছেন, মোট ২২টি কম্পিউটার থেকে প্রসেসর, র‍্যাম, হার্ডডিস্ক এবং একটি প্রিন্টারসহ প্রায় ৪ লাখ টাকার সরকারি সম্পদ চুরি হয়েছে। অভিযোগে সিসিটিভি ফুটেজের ভিত্তিতে এক ব্যক্তিকে শনাক্ত করার কথাও উল্লেখ করা হয়েছে। এসব ঘটনায় মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা বিভাগের আইসিটি কর্মকর্তা এনামুল হক শাহবাগ থানায় লিখিত অভিযোগ জমা দিয়েছেন।

কম্পিউটারের মূল যন্ত্রাংশ না থাকায় সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা নিজ নিজ দাপ্তরিক কম্পিউটার ব্যবহার করতে পারছেন না বলে জানা গেছে। ফলে ই-নথি নিষ্পত্তি, সরকারি চিঠিপত্র প্রস্তুত, নথি যাচাই, প্রশাসনিক আদেশ জারি এবং দৈনন্দিন দাপ্তরিক কার্যক্রম মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে। 

জানতে চাইলে এনামুল হক দ্য ডেইলি ক্যাম্পাসকে বলেন, ‘অধিকাংশ কম্পিউটারের প্রসেসর ও র‌্যাম চুরি হয়েছে। ফলে তথ্য পাচারের কোনো সম্ভাবনা দেখছি না। এছাড়া যে শাখাগুলো থেকে চুরি হয়েছে সেটি কম গুরুত্বপূর্ণ। বিষয়টি নিয়ে অভিযোগ দেওয়া হয়েছে। পুলিশ বিষয়টি তদন্ত করছে।’

চুরির ঘটনার অগ্রগতি সম্পর্কে জানতে চাইলে শাহবাগ থানার সাব ইন্সপেক্টর (এসআই) মো. রোকনুজ্জামান বলেন, ‘আমি ছুটিতে আছি। ছুটি শেষে বিষয়টি খতিয়ে দেখা হবে।’

চুরির ঘটনায় অভিযুক্ত মো. মাহবুব হোসেন পলাতক থাকায় তার বক্তব্য নেওয়া সম্ভব হয়নি।

কার কক্ষ থেকে কী চুরি
মন্ত্রণালয় সূত্র জানিয়েছে, নীতি ও সংস্কার অধিশাখার যুগ্মসচিব খোদেজা খাতুন (কক্ষ-১৭১৩), বিশ্ববিদ্যালয় অধিশাখার যুগ্মসচিব শারমিনা নাসরীন (কক্ষ-১৭০৩) ও কলেজ-২ অধিশাখার যুগ্মসচিব রোখছানা বেগমের (কক্ষ-১৭২৫) রুম থেকে ASUS Expert Center D700 কম্পিউটার থেকে প্রসেসর ও র‍্যাম খুলে নেওয়া হয়েছে। অন্যদিকে প্রশাসন অধিশাখার যুগ্মসচিব তরফদার মো. আক্তার জামিল (কক্ষ-১৭০১)-এর HP Pro 290 G9 কম্পিউটার থেকে একসঙ্গে প্রসেসর, র‍্যাম ও হার্ডডিস্ক খুলে নেওয়া হয়েছে।

উপসচিবদের মধ্যে সরকারি কলেজ- ৪ শাখার ড. জান্নাতুল ফেরদৌস (কক্ষ-১৮২৩)-এর কম্পিউটার থেকে প্রসেসর, সরকারি কলেজ-৩ শাখার মো. আব্দুল কুদ্দুস (কক্ষ-১৮০২) এবং পরিকল্পনা শাখার নুসরাত জাহানের (কক্ষ-১৭০৩) কম্পিউটার থেকে প্রসেসর ও র‍্যাম খুলে নেওয়া হয়েছে।

এছাড়া সিনিয়র সহকারী সচিব ফারহান লীবাব জিসান (কক্ষ-১৭১৯) ও মনজুরুল আলমের (কক্ষ-১৮২৫) কম্পিউটার থেকেও প্রসেসর ও র‍্যাম চুরি হয়েছে।

একইভাবে প্রশাসনিক কর্মকর্তা চায়না আক্তার, ব্যক্তিগত কর্মকর্তা মোহাম্মদ রুবায়েত হোসাইন, আলীমুন্নেছা রেশমা, মিঠুন তালুকদার, অফিস সহকারী-কাম-কম্পিউটার মুদ্রাক্ষরিক আতিকুল ইসলাম এবং বিভাগীয় সভাকক্ষের কম্পিউটার থেকেও প্রসেসর ও র‍্যাম খুলে নেওয়া হয়েছে।

স্থবির কার্যক্রম
কম্পিউটারের মূল যন্ত্রাংশ না থাকায় সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা নিজ নিজ দাপ্তরিক কম্পিউটার ব্যবহার করতে পারছেন না বলে জানা গেছে। ফলে ই-নথি নিষ্পত্তি, সরকারি চিঠিপত্র প্রস্তুত, নথি যাচাই, প্রশাসনিক আদেশ জারি এবং দৈনন্দিন দাপ্তরিক কার্যক্রম মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে।

নাম অপ্রকাশিত রাখার শর্তে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের এক কর্মকর্তা দ্য ডেইলি ক্যাম্পাসকে বলেন, ‘কম্পিউটার চালু না হওয়া অনেকে অন্যের কম্পিউটার ব্যবহার করে গুরুত্বপূর্ণ কাজ শেষ করছেন। তবে স্বাভাবিক কার্যক্রমে স্থবিরতা তৈরি হয়েছে। এটি দূর করতে দ্রুত কম্পিউটারের যন্ত্রাংশ ক্রয় করা দরকার।’