বাতিল হওয়া লাইসেন্স ফিরে পেয়েছে রাজধানীর মগবাজারের আদ্-দ্বীন মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল। আজ সোমবার (২৭ জুলাই) স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয়ে এক বৈঠকে এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। আদ্-দ্বীন কর্তৃপক্ষ হাসপাতালটিতে ব্যাপক পরিবর্তন ও সংস্কার আনায় এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হচ্ছে। ইতোমধ্যে হাসপাতালটি পরিদর্শন করেছে স্বাস্থ্য অধিদফতরের চিকিৎসক দল। হাসপাতালটি পরিদর্শন শেষে সন্তোষ প্রকাশ করেছে প্রতিনিধি দল। সেইসঙ্গে আদ্-দ্বীন হাসপাতালকে যেসব পরামর্শ দিয়েছেন তারা এবং সেটিও আমলে নিয়েছে আদ্-দ্বীন কর্তৃপক্ষ।
চিকিৎসায় অবহেলায় গত ২৭ মে আদ্-দ্বীন হাসপাতালের পোস্ট-ডেলিভারি ওয়ার্ড-২-এ ছয় নবজাতকের মৃত্যু হয়। এই ঘটনা দেশজুড়ে তোলপাড় সৃষ্টি করে এবং এ ঘটনায় তদন্ত কমিটি গঠন করে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়। তদন্ত প্রতিবেদনে ওয়ার্ডে অক্সিজেনের স্বল্পতা, দীর্ঘসময় এসি বন্ধ থাকা, বিকল্প ভেন্টিলেশন ব্যবস্থা না থাকা, বাতাসে কার্বন ডাই-অক্সাইডের মাত্রা বৃদ্ধি এবং হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের চরম অবহেলাকে মৃত্যুর কারণ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়। পরে হাসপাতালটির লাইসেন্স স্থগিত (বাতিল) করে দেয় স্বাস্থ্য অধিদফতর। পুনরায় লাইসেন্স চেয়ে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ে আবেদন জমা দেয় আদ্-দ্বীন কর্তৃপক্ষ।
এদিকে আদ্-দ্বীন মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের লাইসেন্স বাতিল হওয়ায় সৃষ্ট অচলাবস্থা কাটেনি। একদিকে হাসপাতালটির কার্যক্রম বন্ধ থাকায় ব্যাহত হচ্ছে চিকিৎসাসেবা, অন্যদিকে মেডিকেল কলেজে অধ্যয়নরত ২৯৫ জন বিদেশি শিক্ষার্থীসহ শত শত শিক্ষার্থী পড়েছেন চরম অনিশ্চয়তায়। বিষয়টির সমাধানে বিদেশি মেডিকেল শিক্ষার্থী, দেশীয় রোগী এবং হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ বেশ দৌড়ঝাঁপ করছেন। এ নিয়ে ব্যাপক আলোচনা হয়েছে জাতীয় সংসদেও। সরকারের সব শর্ত মেনে হাসপাতাল চালু করতে চায় কর্তৃপক্ষ। সরকারও এ বিষয়ে নমনীয়।
এ বিষয়ে স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রী সরদার মো. সাখাওয়াত হোসেন বকুল বলেন, আদ-দ্বীন হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ তাদের ত্রুটিগুলো সংশোধনের দাবি করে পুনরায় পরিদর্শনের আবেদন করেছে। স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা পরিদর্শন করে বাস্তব পরিস্থিতি মূল্যায়ন করবেন। পরিদর্শনে সন্তোষজনক অগ্রগতি পাওয়া গেলে সরকার প্রয়োজনীয় সিদ্ধান্ত নেবে। সরকার পরিদর্শন করে পরিস্থিতি সন্তোষজনক মনে করলে পরবর্তী সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।
ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারের বিষয়ে তিনি বলেন, হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ ভুক্তভোগী পরিবারকে আর্থিক সহায়তা দিয়েছে বলে তিনি জেনেছেন। তবে এ ঘটনায় একটি মামলা বিচারাধীন রয়েছে। তিনি বলেন, মামলার বিষয়ে সিদ্ধান্ত আদালত ও আইন অনুযায়ী হবে।
পরে গত ১৮ জুলাই হাসপাতালটি পরিদর্শন করে স্বাস্থ্য অধিদফতরের পরিদর্শন টিম। স্বাস্থ্য অধিদফতরের উপপরিচালক (হাসপাতাল) ডা. সৈয়দ আবু আহাম্মদ শাফী বলেন, যে পর্যবেক্ষণগুলোর ভিত্তিতে হাসপাতালটির লাইসেন্স বাতিল করা হয়েছিল, সেগুলো নিয়ে কর্তৃপক্ষকে আগেই কারণ দর্শানোর নোটিশ দেওয়া হয়েছিল। হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ সেসব বিষয়ে কাজ করেছে এবং পরে আপিল করেছে। এখন আপিল বিবেচনাকারীরা বিষয়গুলো পর্যালোচনা করবেন। স্বাস্থ্য অধিদফতর পরিদর্শনের প্রতিবেদন জমা দেবে।
তিনি বলেন, মন্ত্রী, সচিব ও প্রধানমন্ত্রী—সবাই স্বাস্থ্য খাত নিয়ে চিন্তিত। আমরা সবাই ইতিবাচকভাবে চিন্তা করছি। যেসব ঘাটতি রয়েছে, সেগুলো আমাদের সবারই কষ্টের বিষয়। আমরা সব সময় ইতিবাচকভাবে চিন্তা করে কাজ করার চেষ্টা করছি। পুরো বিষয়টি নিয়ে স্বাস্থ্য অধিদফতরের টিমের সঙ্গে আলোচনা করা হবে। এরপর পর্যালোচনা করে সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে। হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ যেসব দৃশ্যমান পরিবর্তন করেছে, পরিদর্শনে সেগুলো দেখা গেছে।
জানতে চাইলে আদ-দ্বীন ফাউন্ডেশনের (কোম্পানি অ্যাফেয়ার্স) পরিচালক তারিকুল ইসলাম মুকুল ঢাকা মেইলকে বলেন, সরকারি নির্দেশনা পূর্ণাঙ্গভাবে অনুসরণ করে আমরা আমাদের পুরো হাসপাতালের ওয়ার্ডগুলো ঢেলে সাজিয়েছি। যেসব স্থান বা ওয়ার্ড নিয়ে আগে জটিলতা কিংবা অসমঞ্জস্যতা ছিল, সেগুলো ভেঙে সম্পূর্ণ নতুন আঙ্গিকে ও আধুনিক নকশায় রূপান্তর করা হয়েছে। সরকারি নিয়ম অনুযায়ী যেভাবে বেডের সেটআপ থাকা প্রয়োজন, ঠিক সেভাবেই প্রতিটি শয্যা বিন্যাস নিশ্চিত করা হয়েছে।
তিনি বলেন, পুরো হাসপাতালেই এখন ব্যাপক সংস্কার কাজ চালানো হয়েছে। প্রতিটি ওয়ার্ডের কেবিন থেকে শুরু করে শিশু ওয়ার্ডকে অত্যন্ত দৃষ্টিনন্দন ও যুগের চাহিদা অনুযায়ী অত্যাধুনিক করা হয়েছে। একই সাথে সাধারণ ডায়রিয়া ওয়ার্ড এবং পোস্ট-অপারেটিভ ওয়ার্ডগুলোকে আধুনিক চিকিৎসাসেবার মানদণ্ডে উন্নীত করা হয়েছে। পরিচ্ছন্নতা বজায় রাখা এবং সংক্রমণের ঝুঁকি শূন্যের কোঠায় নামিয়ে আনতে হাসপাতালের সর্বত্র মেঝেতে বিশেষ ‘এপক্সি’ কোটিং করা হয়েছে, যা দেশের খুব কম হাসপাতালেই দেখা যায়।
তারিকুল ইসলাম মুকুল বলেন, সরকারি নির্দেশনার চেয়েও অতিরিক্ত গুরুত্ব দিয়ে আমরা হাসপাতালটি প্রস্তুত করেছি। সার্বক্ষণিক তদারকির মাধ্যমে পুরো ম্যানেজমেন্ট ও কর্মীদল দিন-রাত কাজ করে একে সম্পূর্ণ নতুন রূপ দিয়েছে। সর্বশেষ পরিদর্শনকালে পরিদর্শনের দায়িত্বে থাকা কর্মকর্তারা আমাদের সার্বিক প্রস্তুতি দেখে গেছেন। তাদের দেওয়া ছোটখাটো নির্দেশনাগুলোও ইতোমধ্যে পুরোপুরি বাস্তবায়ন করা হয়েছে। ফলে সরকারের পক্ষ থেকে হাসপাতাল চালুর বিষয়ে একটি দ্রুত ও ইতিবাচক সিদ্ধান্ত আসবে বলেই আমরা শতভাগ আশাবাদী।
এদিকে আদ্-দ্বীন মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের কার্যক্রম বন্ধ হওয়ায় সাশ্রয়ীমূল্যে স্বল্প আয়ের মানুষ চিকিৎসাসেবা থেকে বঞ্চিত হচ্ছে।
রোগীবান্ধব হাসপাতাল হিসেবে আদ্-দ্বীন হাসপাতালের স্বাভাবিক কার্যক্রম অতি দ্রুত শুরু করার আহ্বান জানিয়ে গণস্বাস্থ্য কেন্দ্রের চেয়ারপারসন শিরীন পারভিন বলেন, আদ্-দ্বীন হাসপাতাল সীমিত ও স্বল্প আয়ের মানুষের জন্য সাশ্রয়ীমূল্যে স্বাস্থ্যসেবা প্রদানকারী একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠান হিসেবে পরিচিত। এই হাসপাতালের মাধ্যমে লাখ লাখ দরিদ্র ও নিম্নবিত্ত মানুষ দীর্ঘদিন স্বল্পমূল্যে সুচিকিৎসা পেয়ে আসছে। সম্প্রতি ওই হাসপাতালে ঘটে যাওয়া একটি দুর্ঘটনাকে কেন্দ্র করে সরকার হাসপাতালের কার্যক্রম বন্ধ করার যে সিদ্ধান্ত নিয়েছে তা অত্যন্ত দুঃখজনক এবং সুবিবেচনাপ্রসূত নয় বলেই আমরা মনে করি।
এছাড়া ছয় শিশুর মৃত্যুর ঘটনায় আদ্-দ্বীন মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের লাইসেন্স বাতিল করা সর্বোত্তম সমাধান নয় বলে মন্তব্য করেছে বেসরকারি হাসপাতাল মালিকদের সংগঠন বিপিএইচসিডিএ। সংগঠনটির সভাপতি ডা. মো. মোসাদ্দেক হোসেন বিশ্বাস ডাম্বেল ও মহাসচিব ডা. এ এম শামীম এক যৌথ বিবৃতিতে বলেন, ঘটনাটি অত্যন্ত দুঃখজনক, বেদনাদায়ক এবং অনাকাঙ্ক্ষিত। তদন্তের মাধ্যমে যদি কোনো ধরনের অবহেলা বা দায়িত্বে ঘাটতির প্রমাণ পাওয়া যায়, তবে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া অবশ্যই প্রয়োজন। একই সঙ্গে ভুক্তভোগী পরিবারগুলোকে ক্ষতিপূরণ দেওয়া আবশ্যক। তবে, একটি নির্দিষ্ট ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে দীর্ঘদিনের চিকিৎসা সেবাদানকারী প্রতিষ্ঠানের লাইসেন্স স্থায়ীভাবে বাতিল করে দেওয়া সমস্যার সর্বোত্তম সমাধান নয়। এতে মূলত ক্ষতিগ্রস্ত হবে মধ্যবিত্ত, গরিব ও নিম্নবিত্ত শ্রেণির মানুষ; যারা ব্যয়বহুল হাসপাতালে চিকিৎসাসেবা নিতে সমর্থ নয়— যা মোটেও কাম্য নয়।
এর আগে স্বাস্থ্য অধিদফতরের মহাপরিচালক অধ্যাপক ডা. প্রভাত চন্দ্র বিশ্বাস জানিয়েছেন, ছয় নবজাতকের মৃত্যুর ঘটনায় ৪ জুন হাসপাতাল কর্তৃপক্ষকে কারণ দর্শানোর নোটিশ দেয় অধিদফতর। কিন্তু নোটিসের যে জবাব ও ব্যাখ্যা আদ-দ্বীন কর্তৃপক্ষের দিয়েছে, তা সন্তোষজনক না হওয়ায় মেডিকেল প্র্যাকটিস অ্যান্ড প্রাইভেট ক্লিনিক অ্যান্ড ল্যাবরেটরিজ রেগুলেশন অর্ডিনেন্স অনুযায়ী হাসপাতালের লাইসেন্স বাতিল করা হয়েছে। লাইসেন্স বাতিলের পরবর্তী ৩০ দিনের মধ্যে এর বিরুদ্ধে সরকারের কাছে আপিল করার সুযোগ ছিল। সে অনুযায়ী ২৪ জুন আপিল করে আদ-দ্বীন কর্তৃপক্ষ।
জানতে চাইলে সরকারের স্বাস্থ্যের শীর্ষ পর্যায়ের একজন কর্মকর্তা ঢাকা মেইলকে বলেন, আদ্-দ্বীন হাসপাতাল লাইসেন্স ফিরিয়ে দেওয়ার জন্য আবেদন করেছে। তাদের লাইসেন্স ফিরিয়ে দেওয়ার বিষয়ে ভাবছে সরকার। কেননা, স্বল্পমূল্যে সেবাদান ও উন্নত সেবা দেওয়ার জন্য দীর্ঘ দিনের পরিচিতি রয়েছে এই মেডিকেলটি। তারাও নিজেদেরকে সংশোধন করে নিয়েছে এবং হাসপাতালটিতে ব্যাপক সংস্কার করা হয়েছে। ভবিষ্যতে আরও ভালো কাজ করবে বলে জানিয়েছে। হাসপাতালটি আপিল শুনানির মাধ্যমে লাইসেন্স পেতে পারে। সরকারের পক্ষ থেকে ইতিবাচক মনোভাব রয়েছে। হাসপাতালটির লাইসেন্স ফিরিয়ে দিতে প্রস্তুতি চলছে।
