হ্রাস পাচ্ছে পুরুষের প্রজননক্ষমতা, ৫০ বছরে টেস্টোস্টেরন কমেছে ৫৪ শতাংশ: গবেষণা

গত পাঁচ দশকে পুরুষের টেস্টোস্টেরনের মাত্রা প্রায় অর্ধেকে নেমে গেছে—এমন গবেষণার ফল নতুন করে প্রশ্ন তুলেছে পুরুষের প্রজননক্ষমতা নিয়ে। একই সময়ে শুক্রাণুর সংখ্যা ও গুণমান কমে যাওয়ার সম্ভাবনাও উদ্বেগ বাড়াচ্ছে। স্থূলতা, ডায়াবেটিস ও আধুনিক জীবনযাপনের পাশাপাশি বায়ুদূষণ, মাইক্রোপ্লাস্টিক এবং বিভিন্ন রাসায়নিককে এর সম্ভাব্য কারণ হিসেবে দেখছেন গবেষকরা। তবে পুরুষের প্রজননক্ষমতা সত্যিই বড় ধরনের সংকটের মুখে পড়েছে কি না, কিংবা এর পেছনে কোন কারণগুলো সবচেয়ে বেশি দায়ী—তা নিয়ে বিজ্ঞানীদের মধ্যে এখনো রয়েছে মতভেদ।

সাম্প্রতিক এক গবেষণায় গত ৫০ বছরে পুরুষদের গড় টেস্টোস্টেরনের মাত্রা প্রায় অর্ধেকে নেমে যাওয়ার দাবি করা হয়েছে। গবেষণাটির নেতৃত্ব দেওয়া অধ্যাপক হাগাই লেভিন এটিকে গুরুতর জনস্বাস্থ্য সংকেত হিসেবে দেখছেন। তাঁর মতে, বিষয়টি নিয়ে এখনই কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া প্রয়োজন।

এর আগে লেভিন ও তাঁর সহকর্মীরা বিশ্বজুড়ে পুরুষের শুক্রাণুর সংখ্যা উল্লেখযোগ্যভাবে কমে যাওয়ার দাবি করেছিলেন। ওই গবেষণাকে ঘিরে ‘স্পার্মাগেডন’ শব্দটিও জনপ্রিয় হয়ে ওঠে। এমনকি কিছু গবেষক আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন, বর্তমান প্রবণতা অব্যাহত থাকলে কয়েক দশকের মধ্যে পুরুষের শুক্রাণুর সংখ্যা ভয়াবহ পর্যায়ে নেমে যেতে পারে।

তবে এই আশঙ্কার সঙ্গে একমত নন অনেক বিশেষজ্ঞ

ম্যানচেস্টার বিশ্ববিদ্যালয়ের অ্যান্ড্রোলজি অধ্যাপক অ্যালান পেসির নেতৃত্বে করা পরবর্তী বিশ্লেষণে শুক্রাণুর সংখ্যায় বড় ধরনের পতনের শক্ত প্রমাণ পাওয়া যায়নি। তবে শুক্রাণুর গুণমানের কিছু সূচক খারাপ হওয়ার ইঙ্গিত পাওয়া গেছে।

বিশেষজ্ঞদের একটি অংশের মত, পুরুষের প্রজননস্বাস্থ্যের অবনতির পেছনে পরিবেশগত দূষণের চেয়ে স্থূলতা ও বিপাকীয় স্বাস্থ্য সমস্যা বেশি গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে।

ইম্পেরিয়াল কলেজ লন্ডনের অধ্যাপক চান্না জয়াসেনা বলেন, গত কয়েক দশকে স্থূলতা ও ডায়াবেটিসের হার ব্যাপকভাবে বেড়েছে। শরীরে অতিরিক্ত চর্বি টেস্টোস্টেরনের স্বাভাবিক ভারসাম্যকে ব্যাহত করতে পারে। একই সঙ্গে অতিরিক্ত ওজন অণ্ডথলির তাপমাত্রা বাড়িয়ে শুক্রাণু উৎপাদনেও নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে।

ডায়াবেটিসও কম টেস্টোস্টেরন, শুক্রাণুর ডিএনএ ক্ষতি এবং যৌন সক্ষমতা কমে যাওয়ার সঙ্গে সম্পর্কিত বলে গবেষণায় উঠে এসেছে।

মাইক্রোপ্লাস্টিক ও রাসায়নিক নিয়ে উদ্বেগ

পুরুষের প্রজননস্বাস্থ্যে মাইক্রোপ্লাস্টিক ও বিভিন্ন রাসায়নিক পদার্থের সম্ভাব্য প্রভাব নিয়েও গবেষণা চলছে। মানুষের বীর্য ও অণ্ডকোষে মাইক্রোপ্লাস্টিকের উপস্থিতি শনাক্ত হয়েছে—এমন গবেষণা রয়েছে। আবার প্রাণীর ওপর পরিচালিত কিছু গবেষণায় নির্দিষ্ট রাসায়নিকের সংস্পর্শে অস্বাভাবিক শুক্রাণু ও প্রজননগত পরিবর্তনের কথা বলা হয়েছে।

তবে বিজ্ঞানীরা সতর্ক করে বলছেন, শরীরে কোনো রাসায়নিক বা মাইক্রোপ্লাস্টিক পাওয়া গেলেই সেটি স্বাস্থ্যঝুঁকি তৈরি করছে—এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছানো যায় না।

এডিনবরা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক রড মিচেলের গবেষণায় কিছু বহুল আলোচিত রাসায়নিকের সংস্পর্শে মানব ভ্রূণের অণ্ডকোষের টিস্যুর টেস্টোস্টেরন উৎপাদন বা বিকাশে উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন পাওয়া যায়নি। তাঁর মতে, প্রাণীর ওপর করা কিছু গবেষণার ফলাফল সরাসরি মানুষের ক্ষেত্রে প্রয়োগ করা বিভ্রান্তিকর হতে পারে।

চিকিৎসকদের বড় উদ্বেগ ‘টেস্টোস্টেরন থেরাপি’

পুরুষের টেস্টোস্টেরন কমে যাওয়ার খবর ছড়িয়ে পড়ায় চিকিৎসকদের আরেকটি উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করছেন, চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া টেস্টোস্টেরন জেল বা ইনজেকশন ব্যবহার করলে উল্টো শুক্রাণু উৎপাদন কমে যেতে পারে।

বাইরে থেকে টেস্টোস্টেরন গ্রহণ করলে মস্তিষ্ক শরীরের নিজস্ব টেস্টোস্টেরন উৎপাদনের সংকেত কমিয়ে দেয়। এর ফলে অণ্ডকোষে প্রয়োজনীয় উচ্চ মাত্রার টেস্টোস্টেরন বজায় থাকে না এবং শুক্রাণু উৎপাদন ব্যাহত হতে পারে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, সন্তান নেওয়ার পরিকল্পনা করছেন এমন পুরুষদের ক্ষেত্রে চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া টেস্টোস্টেরন রিপ্লেসমেন্ট থেরাপি শুরু করা ঝুঁকিপূর্ণ হতে পারে।

চিকিৎসায় আসছে নতুন প্রযুক্তি

পুরুষের বন্ধ্যাত্ব নিয়ে উদ্বেগ থাকলেও চিকিৎসাক্ষেত্রে নতুন কিছু প্রযুক্তি আশার আলো দেখাচ্ছে। মাইক্রোফ্লুইডিক্স প্রযুক্তির মাধ্যমে ক্ষুদ্র চ্যানেলের মধ্য দিয়ে শুক্রাণু চালিয়ে তুলনামূলকভাবে সক্ষম শুক্রাণু নির্বাচন করার পদ্ধতি নিয়ে গবেষণা চলছে।

শুক্রাণুর ডিএনএ ক্ষতি শনাক্ত ও স্বাস্থ্যকর শুক্রাণু বাছাইয়েও নতুন প্রযুক্তি নিয়ে কাজ হচ্ছে। বিপুলসংখ্যক শুক্রাণুর মধ্য থেকে সবচেয়ে ভালো কোষ নির্বাচন করার ক্ষেত্রে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ভবিষ্যতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে বলে বিশেষজ্ঞদের ধারণা।

এ ছাড়া পরীক্ষাগারে স্টেম সেল থেকে মানব শুক্রাণু তৈরির মতো উচ্চাভিলাষী গবেষণাও এগোচ্ছে। তবে এসব প্রযুক্তির অনেকগুলো এখনো গবেষণা ও উন্নয়নের পর্যায়ে রয়েছে এবং ব্যাপক চিকিৎসা ব্যবহারের আগে আরও পরীক্ষা-নিরীক্ষা প্রয়োজন।

আতঙ্ক নয়, প্রয়োজন সতর্কতা

বিশেষজ্ঞদের মধ্যে পুরুষের উর্বরতা নিয়ে উদ্বেগ থাকলেও সবাই ‘মানবজাতির বিলুপ্তি’ ধরনের ভবিষ্যদ্বাণীকে সমর্থন করছেন না। গবেষণাগুলোর ফলাফল, ব্যবহৃত পদ্ধতি এবং তথ্য বিশ্লেষণ নিয়ে মতভেদ রয়েছে।

তবে স্থূলতা, ডায়াবেটিস, বায়ুদূষণ এবং ক্ষতিকর রাসায়নিকের সংস্পর্শ কমানোর মতো পদক্ষেপ সামগ্রিক স্বাস্থ্যের জন্য উপকারী—এ বিষয়ে বিজ্ঞানীদের মধ্যে তুলনামূলকভাবে বেশি ঐকমত্য রয়েছে।

বর্তমানে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, পুরুষের প্রজননস্বাস্থ্যকে নারীর প্রজননস্বাস্থ্যের মতোই গুরুত্ব দেওয়া এবং বন্ধ্যাত্বের ক্ষেত্রে পুরুষেরও দ্রুত শারীরিক পরীক্ষা, স্বাস্থ্য-ইতিহাস ও বীর্য পরীক্ষা করা।

বিশেষজ্ঞদের মতে, পুরুষের উর্বরতা নিয়ে আতঙ্ক ছড়ানোর বদলে শক্ত প্রমাণের ভিত্তিতে গবেষণা চালানো এবং চিকিৎসাযোগ্য সমস্যাগুলো দ্রুত শনাক্ত করাই এখন সবচেয়ে জরুরি।

সূত্র: দ্য গার্ডিয়ান

Check Also

সৌদি প্রবাসীদের জন্য ‘অত্যন্ত জরুরি’ বার্তা বাংলাদেশ দূতাবাসের

ইয়েমেনের সশস্ত্র হুথি গোষ্ঠীর হামলার পরিপ্রেক্ষিতে রিয়াদে অবস্থিত বাংলাদেশ দূতাবাস সৌদি আরবে বসবাসরত প্রবাসীদের সতর্ক …

```html
আমাকে লাইক দিন
```
Premium SEO Backlinks
Premium SEO Backlinks