চুয়াডাঙ্গার আলমডাঙ্গায় সিজারিয়ান অস্ত্রোপচারের পর স্ত্রীর পেটে সংক্রমণ ও পরবর্তী সময়ে পুনরায় অস্ত্রোপচার করানোর ঘটনায় চিকিৎসা ব্যয়ের অর্থ ফেরত না পাওয়ার অভিযোগে চুয়াডাঙ্গার সিভিল সার্জন, আলমডাঙ্গার আব্দুল হামিদ মেমোরিয়াল হাসপাতাল অ্যান্ড ক্লিনিকের মালিক বাবলু ও তার ছেলে আবিরের বিরুদ্ধে থানায় লিখিত অভিযোগ করেছেন মো. সন্টু রহমান (৩৫) নামের এক ব্যক্তি।
গত বৃহস্পতিবার (১ অক্টোবর) আলমডাঙ্গা থানায় দেওয়া লিখিত অভিযোগে সন্টু রহমান উল্লেখ করেন, তার স্ত্রী মোছা. চুমকি খাতুনের গত ২০ আগস্ট আলমডাঙ্গা থানাধীন আনন্দধাম রোডসংলগ্ন আব্দুল হামিদ মেমোরিয়াল হাসপাতাল অ্যান্ড ক্লিনিকে সিজারিয়ান অস্ত্রোপচারের মাধ্যমে সন্তান প্রসব হয়।
অভিযোগে তিনি দাবি করেন, অস্ত্রোপচারের পর অপারেশনের স্থান যথাযথভাবে পরিষ্কার না করেই সেলাই করা হয়। এ সময় সেখানে চিকিৎসক চুয়াডাঙ্গার সিভিল সার্জন ডা. জিয়া উদ্দিন হাদী, ডা. সালাম ও অভিযুক্ত আবির উপস্থিত ছিলেন বলে অভিযোগে উল্লেখ করা হয়েছে। অস্ত্রোপচার করেছিলেন চুয়াডাঙ্গার সিভিল সার্জন ডা. জিয়া উদ্দিন হাদী।
সন্টুর অভিযোগ, অস্ত্রোপচারের কয়েকদিন পর থেকেই তার স্ত্রীর পেটে অস্বাভাবিক জ্বালাযন্ত্রণা শুরু হয়। বিষয়টি ক্লিনিকের মালিক বাবলুকে জানালে তিনি সেটিকে গ্যাসের ব্যথা বলে কিছু ওষুধ দেন। কিন্তু ওষুধ সেবনের পরও ব্যথার কোনো উন্নতি না হওয়ায় স্ত্রীকে চিকিৎসক ডা. জিয়া উদ্দিন হাদীর কাছে নিয়ে যান তিনি।
অভিযোগে আরও বলা হয়, চিকিৎসক হাদী নিজ হাতে তার স্ত্রীর পেট পরীক্ষা করে পুনরায় আলমডাঙ্গার আব্দুল হামিদ মেমোরিয়াল হাসপাতাল অ্যান্ড ক্লিনিকে ভর্তি হওয়ার পরামর্শ দেন এবং ওষুধ লিখে দেন। চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী চুমকি খাতুনকে আবারও ওই ক্লিনিকে ভর্তি করা হয়। সেখানে তিন দিন চিকিৎসাধীন থাকার পরও তার পেটের জ্বালাযন্ত্রণা না কমায় গত ৪ সেপ্টেম্বর তাকে কুষ্টিয়ার চিকিৎসক ডা. এস এম মুসা করিবের কাছে নেওয়া হয়।
সন্টু রহমানের ভাষ্য অনুযায়ী, কুষ্টিয়ার পপুলার ডায়াগনস্টিক সেন্টারের চিকিৎসক সনজিনের মাধ্যমে তার স্ত্রীর আল্ট্রাসনোগ্রাম করানো হয়। সেখানে তাকে জানানো হয়, অস্ত্রোপচারের স্থান পরিষ্কার না করে সেলাই করার কারণে পেটের ভেতরে ময়লা জমে সংক্রমণ হয়েছে। পরে তাকে কুষ্টিয়া মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি হওয়ার পরামর্শ দেওয়া হয়।
অভিযোগকারী জানান, ওই পরামর্শ অনুযায়ী গত ৪ সেপ্টেম্বর সন্ধ্যা ৬টার দিকে তার স্ত্রীকে কুষ্টিয়া মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। সেখানে ৬ সেপ্টেম্বর তার পুনরায় অস্ত্রোপচার করা হয়। পুরো চিকিৎসা প্রক্রিয়ায় তার প্রায় ১ লাখ ৫ হাজার টাকা ব্যয় হয়েছে বলে অভিযোগে উল্লেখ করেন সন্টু।
অভিযোগে সন্টু আরও দাবি করেন, বিষয়টি আব্দুল হামিদ মেমোরিয়াল হাসপাতাল অ্যান্ড ক্লিনিকের মালিক বাবলুকে জানালে তিনি চিকিৎসা বাবদ ব্যয় হওয়া সম্পূর্ণ টাকা পরিশোধের প্রতিশ্রুতি দেন। এ সময় তাকে ২০ হাজার টাকা দেওয়া হয় এবং বাকি টাকা পরবর্তীতে পরিশোধ করা হবে বলে জানানো হয়। কিন্তু পরবর্তীতে টাকা চাইলে তাকে আজ-কাল করে ঘোরানো হয়। একপর্যায়ে বাকি টাকা দেওয়া হবে না বলেও জানানো হয় বলে অভিযোগ করেন তিনি।
লিখিত অভিযোগে এ বিষয়ে সাক্ষী হিসেবে মো. সাজাহান, রফিকুল ইসলাম ও মো. বেল্টুর নাম উল্লেখ করা হয়েছে। তারা সবাই আলমডাঙ্গার বাদেমাজু গ্রামের বাসিন্দা। এ ছাড়া আরও অনেকে বিষয়টি সম্পর্কে অবগত রয়েছেন বলে অভিযোগে উল্লেখ করা হয়।
অভিযোগকারী সন্টু রহমান বলেন, তিনি অত্যন্ত দরিদ্র এবং ধারদেনা করে স্ত্রীর চিকিৎসার ব্যয় বহন করেছেন। অভিযুক্তরা প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী বাকি অর্থ পরিশোধ না করলে তার স্ত্রীর পরবর্তী চিকিৎসা চালিয়ে যাওয়া কঠিন হয়ে পড়বে এবং বিনা চিকিৎসায় তার বড় ধরনের ক্ষতি হতে পারে—এমন আশঙ্কা থেকেই পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে আলোচনা করে থানায় অভিযোগ করতে বাধ্য হয়েছেন বলে লিখিত অভিযোগে উল্লেখ করেন তিনি।
তবে অভিযোগের বিষয়ে ভিন্ন বক্তব্য দিয়েছেন আব্দুল হামিদ মেমোরিয়াল হাসপাতাল অ্যান্ড ক্লিনিকের স্বত্বাধিকারী বাবলু। তিনি বলেন, চুমকি খাতুনের অস্ত্রোপচার করেছিলেন চিকিৎসক ডা. হাদী জিয়া উদ্দিন আহমেদ এবং অ্যানেসথেশিয়ার দায়িত্বে ছিলেন সহকারী অধ্যাপক ডা. আব্দুস সালাম। অস্ত্রোপচারের পর রোগী সুস্থ অবস্থায় বাড়ি ফিরে গিয়েছিলেন। পরে যে কোন কারণে হয়তো পেটের ভেতরে রক্ত জমাট বাঁধায় কুষ্টিয়া মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে তার পুনরায় অস্ত্রোপচার করা হয়।
সিজারিয়ান অস্ত্রোপচারে কোনো ধরনের ত্রুটি ছিল না দাবি করে বাবলু বলেন, অপারেশনের স্থান পরিষ্কার না করে সেলাই করার কারণে সংক্রমণ হয়েছে—এটি অভিযোগকারীর অজানা কথা। কোনো চিকিৎসক অপারেশনের স্থান পরিষ্কার না করে কি সেলাই করে কেউ। তার দাবি, সবকিছু যথাযথ পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতার সঙ্গেই করা হয়েছে।
বাবলু বলেন, কুষ্টিয়ায় রোগীর অস্ত্রোপচারের সময় তাকে একাধিকবার ফোন করা হয়েছিল। পরে তাদের পক্ষ থেকে ২০ হাজার টাকা দেওয়া হয়েছে। পরবর্তীতে আরও ১০ হাজার টাকা দিতে চাইলেও তা নেওয়া হয়নি বলে দাবি করেন তিনি।
চিকিৎসায় ১ লাখ ৫ হাজার টাকা ব্যয়ের অভিযোগের বিষয়ে বাবলু বলেন, রোগীর পরিবার অত্যন্ত দরিদ্র। তবে সব মিলিয়ে চিকিৎসা বাবদ ৪০ থেকে ৪৫ হাজার টাকার মতো খরচ হতে পারে, এর বেশি নয় বলে তার দাবি।
চুয়াডাঙ্গার সিভিল সার্জন ডা. হাদী জিয়া উদ্দীন আহমেদ বলেন, ‘সারা পৃথিবীতেই অপারেশনের ক্ষেত্রে কিছু জটিলতার বিষয় হরহামেশাই ঘটে। ওই রোগীর ইন্ট্রা-অ্যাবডোমিনাল (পেটের ভেতরে) কিছু কালেকশন থেকে অ্যাবসেসের মতো একটি জটিলতা তৈরি হয়েছিল। পরবর্তীতে সেটি পুনরায় অপারেশন (রিওপেন) করে মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসা দেওয়া হয়েছে।’
তিনি বলেন, ‘প্রথমদিকে রোগী আমার কাছে আসার পর আমি তাদের ক্লিনিকে ভর্তি থেকে চিকিৎসা নেওয়ার পরামর্শ দিয়েছিলাম। কিন্তু তারা ক্লিনিকে না থেকে মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চলে যান। এরপর তারা আর আমার সঙ্গে যোগাযোগ করেননি।’
সিভিল সার্জন আরও বলেন, ‘কোনো অপারেশনই শতভাগ জটিলতামুক্ত হবে, এমন নিশ্চয়তা কেউ দিতে পারেন না। কোনো রোগীর অসুবিধা হলে বিষয়টি মানবিক দৃষ্টিকোণ থেকে বিবেচনা করা এক বিষয়। তবে এ ধরনের অভিযোগের বিষয়টি অত্যন্ত দুঃখজনক। আমরা বিষয়টি নিয়ে খুবই উদ্বিগ্ন। বর্তমানে স্বাস্থ্য বিভাগের ওপর যে পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে, তা এভাবে চলতে থাকলে চিকিৎসকেরা কোনো জটিল বিষয় দেখা দিলে সেটি আর যথাযথভাবে অ্যাড্রেস করতে আগ্রহী হবেন না।’
এ বিষয়ে আলমডাঙ্গা থানার অফিসার ইনচার্জ ওসি মোহাম্মদ রাকিবুল ইসলাম বলেন, আমরা এ বিষয়ে ক্ষতিপূরণ দাবি করে একটি লিখিত অভিযোগ ক্লিনিক মালিক ও মালিকের ছেলের বিরুদ্ধে পেয়েছি, যেহেতু বিষয়টি স্বাস্থ্য খাতে জড়িত সেহেতু বিষয়টি নিয়ে স্বাস্থ্য বিভাগে দায়িত্বপ্রাপ্তদের সাথে আলোচনা করে তদন্ত সাপেক্ষে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।
চুয়াডাঙ্গা সিভিল সার্জন হাদি জিয়া উদ্দিনের নামে অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, সরাসরি অভিযোগ নেই তবে অপারেশনের সময় উপস্থিত থাকার কথা উল্লেখ আছে।
চাকরির বাজার Jobs and Career Solution