প্রাথমিকে নিয়োগপত্র পাননি অন্তত ৭ শতাধিক, ফেসবুকে হাহাকার

সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে সহকারী শিক্ষক পদে নিয়োগের জন্য চূড়ান্তভাবে নির্বাচিত হওয়ার পরও নিয়োগপত্র না পাওয়ার অভিযোগ করেছেন শত শত প্রার্থী। দীর্ঘ অপেক্ষার পর নিয়োগপত্র হাতে পাওয়ার কথা থাকলেও প্রয়োজনীয় কাগজপত্র জমা দেওয়ার পরও অনেকের নাম তালিকায় না থাকায় সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ক্ষোভ ও হতাশা প্রকাশ করছেন তারা।

প্রার্থীদের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, এখন পর্যন্ত দেশের ২৭ জেলার অন্তত ৭৭৮ জন নিয়োগপত্র পাননি। তবে সব জেলার তথ্য এখনো যাচাই করা সম্ভব হয়নি। ফলে এ সংখ্যা আরও বাড়তে পারে বলে ধারণা করছেন সংশ্লিষ্টরা।

সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে সহকারী শিক্ষক পদে নিয়োগপ্রত্যাশী ১৪ হাজারের বেশি প্রার্থীর দীর্ঘ অপেক্ষার অবসান হওয়ার কথা ছিল বৃহস্পতিবার (২৪ সেপ্টেম্বর)। নির্বাচিত প্রার্থীদের অনুকূলে নিয়োগপত্র জারির পর দেশের বিভিন্ন জেলায় সেগুলো বিতরণ শুরু হয়েছে। সংশ্লিষ্ট জেলা প্রাথমিক শিক্ষা কার্যালয় থেকে সুপারিশপ্রাপ্ত প্রার্থীরা সরাসরি নিয়োগপত্র নেওয়ার কথা।

নিয়োগপত্র পাওয়ার পর আগামী ১ অক্টোবর নিজ নিজ জেলা শিক্ষা কার্যালয়ে যোগদান করতে হবে প্রার্থীদের। পূর্বঘোষণা অনুযায়ী, ৪ অক্টোবর থেকে তাদের পদায়ন শুরু হওয়ার কথা রয়েছে।

তবে নিয়োগপত্র বিতরণ শুরু হওয়ার পরই অনেক প্রার্থী জানতে পারেন, চূড়ান্তভাবে নির্বাচিত হওয়ার পরও তাদের নাম নিয়োগপত্রের তালিকায় নেই। এরপর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নিজেদের ক্ষোভ ও হতাশার কথা তুলে ধরছেন তারা।

প্রার্থীদের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, চাঁদপুরে ২৭ জন, মুন্সিগঞ্জে ৩ জন, শরীয়তপুরে ৬ জন, সাতক্ষীরায় ২ জন, ঝালকাঠিতে ১২ জন, লক্ষ্মীপুরে ২ জন, ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় ২৪ জন, চাঁপাইনবাবগঞ্জে ৭ জন, পাবনায় ৩৫ জন, রাজবাড়ীতে ১৫ জন, ফরিদপুরে ১২ জন, বগুড়ায় ৪৮ জন, সুনামগঞ্জে ১২০ জন, কুষ্টিয়ায় ১৬ জন, মানিকগঞ্জে ২২ জন, মাগুরায় ৩৩ জন, খুলনায় ৫৯ জন, নরসিংদীতে ২৭ জন, মাদারীপুরে ২১ জন, জামালপুরে ৫২ জন, চুয়াডাঙ্গায় ২০ জন, পিরোজপুরে ৪৫ জন, রাজশাহীতে ২৮ জন, বাগেরহাটে ২৯ জন, পটুয়াখালীতে ২০ জন, নড়াইলে ৯ জন এবং ভোলায় ৮৪ জন নিয়োগপত্র পাননি।

এর মধ্যে ২৭ জেলার তথ্য অনুযায়ী মোট ৭৭৮ জনের নিয়োগপত্র না পাওয়ার তথ্য পাওয়া গেছে। তবে সব জেলার তথ্য এখনো যাচাই করা সম্ভব হয়নি। ফলে প্রকৃত সংখ্যা আরও বেশি হতে পারে।

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নিজের ক্ষোভের কথা জানিয়েছেন আমজাদ হোসেন ফাহিম। তিনি লিখেছেন, ‘সরকারি প্রাইমারিতে চূড়ান্তভাবে টিকার পরও NSI,DSB Verification এর Negative report এর কারণে ভোলা সদরে নিয়োগপত্রে আমার রোল নেই! এ বিচার আমি কার কাছে দিবো? আমার নামে কি কোনো মামলা আছে? আমি কি রাষ্ট্রদ্রোহিতায় জড়িত? আমার কি স্থায়ী ঠিকানা কিংবা বাবা মায়ের নামের বানান অসংগতি বা আমার সার্টিফিকেটে সমস্যা? আমার বাবা, ভাই কেউ কি কোনোদিন রাজনীতির সাথে জড়িয়েছে? তাহলে কিসের ভিত্তিতে আমাকে বাদ দিলো? ঠিক কী কারণে আমাকে বাদ দেয়া হলো জানতে পারি? এই রাষ্ট্র আমাকে কি জানার সুযোগ দিবে? আমি ইতিমধ্যে ১২ গ্রেডের ১ টা সরকারি চাকুরীতে ঢুকে ছেড়ে দিছি, কুর্মিটোলা মেডিকেলে ১ টা পদে হয়েছিলো জয়েন দেইনি শিক্ষকতা করবো বলে। এটাকে কেমন নিয়োগ বলে যে ১ টা জেলার সদর উপজেলায় ২৮ জনের মধ্যে ১২ জন রেখে বাকি সব বাদ?’

আরেক প্রার্থী রইচ উদ্দিন লিখেছেন, ‘মনে রেখ বাংলাদেশ, কোন ধরনের ফৌজদারী অপরাধ ছাড়া আমাকে বার বার চাকরি থেকে বঞ্চিত করছো। এর হিসাব তোমাকে দিতেই হবে। গত ৮ টা মাস বসিয়ে রেখে চূড়ান্ত ভাবে প্রাইমারিতে সুপারিশপ্রাপ্ত হয়েও আজ আমি নিয়োগ থেকে বাদ। আমার জীবন জাহান্নামে ফেলেছ।’

মো. সায়েক আহমেদ নামে আরেকজন লিখেছেন, ‘জমি জমা নাই দেখে পুলিশ ভ্যারিফিকেশন এর পরে ডেপ্টের এক বন্ধু প্রাইমারির জব থেকে বাদ দিলো। তাকে দলিল দস্তাবেজ দেখাতে বলেছিল। সে তা পারে নি, তখনি নাকি হিন্টস দিয়েছিল খারাপ কিছু হবে। এর কী কোন সাংবিধানিক ব্যাখ্যা আছে?

জমি জমা নাই, বেশ! কিন্তু সে কী এদেশে ভেসে এসেছে! জমি এখন নাই কিন্তু তার ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য তার যোগ্যতা দিয়ে কী স্থায়ী ঠিকানা করার সুযোগটুকু রাষ্ট্র তাকে দিবে না?

ছেলেটার বাবা নাই সেই ফার্স্ট ইয়ার থেকে। তার জীবনে স্টাবল হওয়াটা এখন কতটুক জরুরি ভাবা যায়!’

এদিকে নিয়োগপত্র না পাওয়ার বিষয়টি নিয়ে প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়ের বিদ্যালয়-২ শাখার উপসচিব রাজীব কুমার সরকার বলেন, ‘নিয়োগপত্র প্রদানের তালিকা প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তরে রয়েছে। নির্বাচিত সবাই নিয়োগপত্র পাবে কি না এই বিষয়ে জানা নেই।’

তবে প্রার্থীদের নিয়োগপত্র না পাওয়ার অভিযোগের সঙ্গে একমত নন প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তরের মহাপরিচালক শাহীনা ফেরদৌসী। বৃহস্পতিবার দ্য ডেইলি ক্যাম্পাসকে তিনি বলেন, ‘নিয়োগপত্রগুলো ডাকযোগে পাঠানো হয়েছে। এজন্য অনেক এলাকায় সেগুলো পৌঁছাতে দেরি হতে পারে। এজন্য আমরা যোগদানের তারিখ ১ অক্টোবর পর্যন্ত দিয়েছি। প্রার্থীরা কিছুদিন অপেক্ষা করলে তারাও নিয়োগপত্র পেয়ে যাবেন।’

নতুন করে এনএসআই ভেরিফিকেশনের কারণে কোনো প্রার্থী বাদ পড়েছেন কি না—এমন প্রশ্নের জবাবে অধিদপ্তরের মহাপরিচালক বলেন, ‘কোন প্রার্থী বাদ গেছেন সেটি নির্দিষ্ট করে বলার সময় এখনও হয়নি। আপনি (প্রতিবেদক) নির্দিষ্ট করে তথ্য দিতে পারলে বিষয়টি খোঁজ নিয়ে বলা যেত। কেউ বাদ পড়েছেন এমন কোনো তথ্য আমার কাছে এখনও আসেনি।’

এর আগে গত ৯ জানুয়ারি দেশের ৬১ জেলায় একযোগে সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক নিয়োগের লিখিত পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হয়। পার্বত্য তিন জেলা বাদে অনুষ্ঠিত ওই পরীক্ষায় উত্তীর্ণ ৬৯ হাজার ২৬৫ জন প্রার্থীকে মৌখিক পরীক্ষার জন্য নির্বাচিত করা হয়।

পরে গত ৮ ফেব্রুয়ারি সহকারী শিক্ষক নিয়োগ ২০২৫-এর চূড়ান্ত ফল প্রকাশ করা হয়। এতে ১৪ হাজার ৩৮৪ জন প্রার্থীকে নিয়োগের জন্য প্রাথমিকভাবে নির্বাচিত করা হয়। একই সঙ্গে জেলা অনুযায়ী উত্তীর্ণ প্রার্থীদের তালিকাও প্রকাশ করা হয়।

চূড়ান্ত ফল প্রকাশের পর নিয়োগপত্র পাওয়ার অপেক্ষায় ছিলেন নির্বাচিত প্রার্থীরা। বৃহস্পতিবার বিভিন্ন জেলায় নিয়োগপত্র বিতরণ শুরু হলে একদিকে অনেকের অপেক্ষার অবসান হয়, অন্যদিকে নিয়োগপত্র না পাওয়া প্রার্থীদের মধ্যে নতুন করে তৈরি হয় উদ্বেগ ও অনিশ্চয়তা।