নিউইয়র্ক সিটির মেয়রের সরকারি বাসভবন গ্রেসি ম্যানশনে বৈঠকের পর একে অপরের প্রশংসায় মুখর হয়েছেন মেয়র জোহরান মামদানি ও মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। অভিবাসন, আবাসন প্রকল্প থেকে শুরু করে এমনকি ভবনের সাজসজ্জা নিয়েও প্রায় এক ঘণ্টার বৈঠকে আলোচনা করেন দুই নেতা।
জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের অধিবেশন শুরুর প্রাক্কালে সোমবার (২১ সেপ্টেম্বর) নিউইয়র্কে এই বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। এটি ছিল গত এক বছরের মধ্যে মামদানি ও ট্রাম্পের তৃতীয় সাক্ষাৎ। যুক্তরাষ্ট্রের রাজনীতিতে অপ্রত্যাশিত এই সম্পর্কের ধারাবাহিকতায় এবারও প্রকাশ্যে একে অপরের প্রতি ইতিবাচক মন্তব্য করেন তারা।
গ্রেসি ম্যানশনের লনে সাংবাদিকদের সামনে ট্রাম্প বলেন, নিউইয়র্কের জন্য এবং দেশের জন্য তিনি ভালো কিছু চান। মামদানি একজন ভালো মেয়র হবেন বলেও আশা প্রকাশ করেন তিনি।
ট্রাম্প বলেন, ‘আমি চাই তিনি একজন মহান মেয়র হোন। আমি চাই ‘না’ তিনি খারাপ বা ভয়াবহ মেয়র হোন। তার মধ্যে সেই সম্ভাবনা রয়েছে, অনেক বড় সম্ভাবনা রয়েছে।’
এরপর মামদানির পিঠে হাত রেখে তাকে অভিনন্দন জানান ট্রাম্প।
জবাবে মামদানি বলেন, নিউইয়র্কে ১২ হাজারের বেশি আবাসন ইউনিট নির্মাণের জন্য ফেডারেল সহায়তার বিষয়ে আলোচনাকে নতুন পর্যায়ে নেওয়ার প্রতিশ্রুতির জন্য তিনি প্রেসিডেন্টকে ধন্যবাদ জানান।
মামদানি বলেন, ‘আমি প্রেসিডেন্টের আগ্রহের বিষয়টিকে গুরুত্ব দিচ্ছি। আমরা এটাও জানি, তিনি শুধু দেশের নেতা নন, তিনি এই শহরে অনেক আবাসন নির্মাণ করেছেন।’
তবে দুই নেতার এই সৌহার্দ্যপূর্ণ আচরণের আড়ালেও রয়েছে গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক মতপার্থক্য। বিশেষকরে, নিউইয়র্কে অভিবাসীদের সাময়িক সুরক্ষা বাতিলের সিদ্ধান্ত বৈঠকে অন্যতম আলোচনার বিষয় ছিল।
ট্রাম্প বলেন, ‘মেয়র এ বিষয়ে খুব দৃঢ় অবস্থানে আছেন। আমি বলতে পারি, তিনি বিষয়টি তুলেছেন।’
অভিবাসন নীতি নিয়েও দুই নেতার অবস্থান সম্পূর্ণ ভিন্ন। নিউইয়র্কে যুক্তরাষ্ট্রের অভিবাসন ও শুল্ক প্রয়োগকারী সংস্থা (আইসিই)-এর বাড়তে থাকা গ্রেফতার অভিযান নিয়ে বারবার সমালোচনা করেছেন মামদানি।
হোয়াইট হাউসে কয়েকটি সংবাদমাধ্যমকে নিষিদ্ধ করার সিদ্ধান্ত নিয়েও মামদানি ও ট্রাম্পের অবস্থানে পার্থক্য দেখা গেছে।
ট্রাম্প প্রশাসনের সিদ্ধান্তে পলিটিকো, সিএনএন, এমএস নাও সংবাদমাধ্যম হোয়াইট হাউসের প্রবেশাধিকার হারিয়েছে। এ বিষয়ে মামদানি বলেন, তিনি সংবাদমাধ্যমের স্বাধীন উপস্থিতিতে বিশ্বাস করেন।
মামদানি বলেন, ‘আমি প্রেসিডেন্টকে বলেছি, এখানে আমরা সংবাদমাধ্যমের সব সদস্যকে উপস্থিত রাখবো। আমি এটিতেই বিশ্বাস করি।’
এরপর ট্রাম্প সাংবাদিকদের বলেন, ‘ভুয়া সংবাদ’ থেকে হোয়াইট হাউসকে দূরে রাখার দায়িত্ব তার রয়েছে। নিষেধাজ্ঞার বিষয়ে সংশ্লিষ্ট সংবাদমাধ্যমগুলো প্রেসিডেন্টের বিরুদ্ধে আইনি পদক্ষেপ নিয়েছে।
কুইন্সের পুরোনো রেল ইয়ার্ডে আবাসন প্রকল্প
বৈঠকের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বিষয় ছিল কুইন্সের সানিসাইড ইয়ার্ডে আবাসন নির্মাণ পরিকল্পনা। বিশাল এই রেল ডিপোর ওপর নতুন আবাসন এলাকা গড়ে তোলার পরিকল্পনা কয়েক প্রজন্মের মেয়রের স্বপ্ন হিসেবে বিবেচিত হয়ে আসছে।
মামদানি জানান, তিনি ও ট্রাম্প এই প্রকল্পকে কেবল ধারণাগত আলোচনা থেকে বাস্তব কারিগরি আলোচনার পর্যায়ে নেওয়ার বিষয়ে একমত হয়েছেন। এ নিয়ে নিউইয়র্কের আবাসন বিভাগ ও হোয়াইট হাউসের মধ্যে আলোচনা হবে।
তিনি বলেন, ‘আমরা এমন একটি সম্ভাবনার কথা বলছি, যা আমাদের শহরে খুবই বিরল, একটি সম্পূর্ণ নতুন এলাকা নির্মাণের সুযোগ।’
মামদানি জানান, এই প্রকল্প বাস্তবায়নে ফেডারেল অংশীদারত্ব প্রয়োজন হবে। কারণ এর জন্য বিপুল অর্থায়নের পাশাপাশি রেললাইনের ওপর একটি বিশাল প্ল্যাটফর্ম নির্মাণের অনুমোদন দরকার হবে। সেই প্ল্যাটফর্মের ওপর প্রায় ১২ হাজার বাড়ি এবং প্রায় ৩০ হাজার কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি হতে পারে।
ট্রাম্পের সঙ্গে সম্পর্ক নিয়ে রাজনৈতিক চাপ
জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের অধিবেশন ঘিরে নিউইয়র্কে ব্যস্ত সপ্তাহ পার করছেন মামদানি। আন্তর্জাতিক বামপন্থি নেতাদের সঙ্গেও তার একাধিক বৈঠকের পরিকল্পনা রয়েছে।
তবে ট্রাম্পের সঙ্গে সম্পর্ক বজায় রাখা নিয়ে নিজ দলের মধ্যেও চাপের মুখে রয়েছেন মামদানি। কারণ, মেয়র হওয়ার আগে তিনি ট্রাম্পের তীব্র সমালোচনা করেছিলেন। একসময় তাকে ‘ফ্যাসিস্ট’ বলেও মন্তব্য করেছিলেন মামদানি। কিন্তু দায়িত্ব নেওয়ার পর থেকে ট্রাম্পের সঙ্গে সরাসরি সংঘাত এড়িয়ে চলছেন তিনি।
মামদানির সমর্থকদের একটি অংশ মনে করে, ফেডারেল সরকারের ক্ষমতার কারণে নিউইয়র্কের স্বার্থ রক্ষায় প্রেসিডেন্টের সঙ্গে কার্যকর সম্পর্ক বজায় রাখা প্রয়োজন।
নিউইয়র্ক সিটির ডেমোক্রেটিক সোশ্যালিস্টস অব আমেরিকার (ডিএসএ) নেতা গ্রেস মাউসার বলেন, ট্রাম্প ব্যক্তিগত সমালোচনাকে অনাকাঙ্ক্ষিতভাবে গ্রহণ করতে পারেন, তাই সরাসরি সংঘাতে যাওয়ার ঝুঁকি রয়েছে।
তিনি বলেন, ‘এটি শুধু জোহরানের জন্য নয়, পুরো শহরের জন্য ঝুঁকিপূর্ণ।’
সমালোচনা সত্ত্বেও বৈঠকের পক্ষে মামদানি
তবে মামদানি বলেন, প্রেসিডেন্টের সঙ্গে আলোচনার বাস্তব সুফল রয়েছে। তিনি জানান, ফেব্রুয়ারিতে হোয়াইট হাউসে আগের বৈঠকের পর ট্রাম্প সানিসাইড ইয়ার্ড প্রকল্প নিয়ে আবার যোগাযোগ করেছিলেন। পাশাপাশি, মামদানির দেওয়া তালিকা থেকে ফেডারেল অভিবাসন হেফাজতে থাকা দুই শিক্ষার্থীর বিষয়েও পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছিল।
মামদানি বলেন, ‘যদি একটি বৈঠক কারও আটক হওয়া আর মর্যাদার সঙ্গে বেঁচে থাকার মধ্যে পার্থক্য তৈরি করতে পারে, তাহলে সেই বৈঠক মূল্যবান। তবে একই সঙ্গে আমাদের মতপার্থক্যগুলো নিয়েও সৎ থাকতে হবে।’
এদিকে মামদানি-ট্রাম্প বৈঠক নিয়ে উভয় দলের মধ্যেই সমালোচনা হয়েছে। তবে বৈঠকের পরও দুই নেতার প্রকাশ্য সৌহার্দ্য বজায় ছিল। এমনকি গ্রেসি ম্যানশনের সাজসজ্জার প্রশংসা করে ট্রাম্প বলেন, জায়গাটি তার কাছে একটি বাড়ির মতো মনে হয়েছে এবং এটি ‘সুন্দর একটি স্থান’।
