১০ টাকা কেজিতে ২৪ ঘণ্টায় পার্সেল পৌঁছে দিচ্ছে ডাক বিভাগ

‘সমন্বিত ডাক নেটওয়ার্ক, সীমাহীন সম্ভাবনা’ প্রতিপাদ্য নিয়ে আজ ৯ অক্টোবর দেশে পালিত হবে বিশ্ব ডাক দিবস। দিবসটি উপলক্ষে ৯ থেকে ১৫ অক্টোবর দেশব্যাপী ‘ডাকসেবা সপ্তাহ’ পালন করবে বাংলাদেশ ডাক বিভাগ।
এ উপলক্ষে দেশের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে চিঠি উৎসব, ফিলাটেলিক প্রদর্শনী ও ডাকসেবা বিষয়ক মেলার আয়োজন করা হবে। এ ছাড়া দিবসটি উপলক্ষে আজ ৯ ও আগামীকাল ১০ অক্টোবর ছুটির দিনেও ডাক বিভাগের সব পর্যায়ের কার্যালয়ে সঞ্চয় ব্যাংক কার্যক্রম ছাড়া অন্যান্য ডাকসেবা চালু থাকবে।বিশ্ব ডাক দিবস ২০২৬ এমন সময়ে পালিত হচ্ছে, যখন বাংলাদেশ ডাক বিভাগ ঐতিহ্যবাহী ডাকসেবার পাশাপাশি আধুনিক, প্রযুক্তিনির্ভর ও জনবান্ধব ডাক ও লজিস্টিকস সেবা প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে বিভিন্ন কার্যক্রম বাস্তবায়ন করছে। ই-কমার্স ও লজিস্টিকস সক্ষমতা বৃদ্ধি, ডিজিটাল ট্র্যাকিং ও ট্রেসিং, পোস্ট পিকআপ ও ডেলিভারি, ফুলফিলমেন্ট সেন্টার, কৃষিপণ্য ও মৌসুমি ফল পরিবহন এবং উদ্যোক্তাভিত্তিক ফ্র্যাঞ্চাইজি পোস্ট অফিস চালুর মাধ্যমে ডাকসেবার পরিধি সম্প্রসারণ করা হচ্ছে।
ডাক বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের মার্চ থেকে এ পর্যন্ত স্পিড পোস্টের মাধ্যমে প্রায় ৮১১ টন পণ্য পরিবহন করা হয়েছে। দ্রুত ও সাশ্রয়ী পার্সেল সেবা হিসেবে স্পিড পোস্ট ই-কমার্স, ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তা, কৃষক এবং অনলাইন ব্যবসায়ীদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ পরিবহন মাধ্যমে পরিণত হয়েছে। সরকারের নির্বাচনী অঙ্গীকার ও ঘোষিত ১৮০ দিনের কর্মপরিকল্পনার সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে ফ্র্যাঞ্চাইজি পোস্ট অফিস চালুর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এর মাধ্যমে স্থানীয় পর্যায়ে কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টির পাশাপাশি ডাকসেবা নেটওয়ার্ক আরো সম্প্রসারিত হচ্ছে।
আন্তর্জাতিক পার্সেল পরিবহনেও ডাক বিভাগের সেবায় উল্লেখযোগ্য প্রবৃদ্ধি হয়েছে। ২০২৫-২৬ অর্থবছরের প্রথম তিন মাসে বিদেশগামী পার্সেল পরিবহনের পরিমাণ ছিল ২৪৩ টন। ২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রথম তিন মাসে তা বেড়ে ৩১৬ টনে দাঁড়িয়েছে। অর্থাৎ এক বছরের ব্যবধানে একই সময়ে বিদেশগামী পার্সেল পরিবহন বেড়েছে ৭৩ টন বা প্রায় ২৯.৮৪ শতাংশ।ডাক বিভাগের দাবি, ‘স্পিড পোস্ট’ নামক পার্সেল সার্ভিসের হাত ধরে বাংলাদেশ ডাক বিভাগ নতুন করে নিজের প্রয়োজনীয়তা প্রমাণ করার চেষ্টা করছে।
মাত্র ১০ টাকায় প্রথম কেজি, এরপর প্রতি কেজি ৫ টাকা—এমন কম খরচে স্পিড পোস্টে  বিশেষ ব্যবস্থায় দেশের এক প্রান্ত থেকে অপর প্রান্তে পৌঁছে যাচ্ছে ফ্রিজ, টেলিভিশন, আসবাব, ফল, মাছ-মাংস থেকে শুরু করে মোটরসাইকেলও। ২৪ থেকে ৪৮ ঘণ্টায় পার্সেল পৌঁছে দিয়ে বেসরকারি কুরিয়ারগুলোর বাজারে জায়গা করে নিয়েছে সরকারি এই প্রতিষ্ঠানটি।
সংশ্লিষ্ট সূত্র মতে, ডাক বিভাগের স্পিড পোস্টের মাধ্যমে এমন অনেক পণ্য পরিবহন হচ্ছে, যেগুলো একসময় বেসরকারি কুরিয়ার ছাড়া অন্য কোথাও পাঠানোর সুযোগ ছিল না। ফ্রিজ, আলমারি, ওয়ার্ডরোব, বড় আসবাব, টেলিভিশন, এয়ার কন্ডিশনার, প্রেসার কুকার, ইন্ডাকশন কুকার, বাইসাইকেল, মোটরসাইকেল, কীটনাশক ছিটানোর যন্ত্রও পাঠানো হচ্ছে এ ব্যবস্থায়।  উদ্যোক্তারা পাঠাচ্ছেন মৌসুমি ফল, মাছ ও অন্যান্য পণ্য।
শিক্ষার্থীরা পাঠাচ্ছেন বইপত্র, লেপ-তোশক, বেডিংসহ প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র। এ বছর শুধু ফলের মৌসুমেই প্রায় ৩৫০ মেট্রিক টন ফল পরিবহন করা হয়েছে। আমের পাশাপাশি রংপুর ও দিনাজপুরের লিচু, মধুপুরের আনারস, পাহাড়ি এলাকার ড্রাগন ফল, বরিশালের সুপারি, কক্সবাজারের শুঁটকি, খুলনা অঞ্চলের মাছ এবং পার্বতীপুর থেকে কাঁচা মাংসও পাঠানো হচ্ছে। কেউ কেউ বিশেষভাবে প্যাকেট করে রান্না করা খাবারও পাঠাচ্ছেন।ডাক বিভাগের মহাপরিচালক কাজী আসাদুল ইসলাম কালের কণ্ঠকে বলেন, স্পিড পোস্ট ২০১৮ সালে চালু হলেও নানা লজিস্টিক ও প্রযুক্তিগত সীমাবদ্ধতার কারণে প্রত্যাশিত সাফল্য পায়নি। এখন নতুনভাবে সেবাটিকে জনপ্রিয় করার কাজ চলছে। দেশের যেকোনো প্রান্ত থেকে ২৪ ঘণ্টার মধ্যে ঢাকায় পার্সেল পৌঁছে দেওয়া হচ্ছে। দূরবর্তী জেলা বা প্রত্যন্ত অঞ্চলে সর্বোচ্চ ৪৮ ঘণ্টা সময় লাগছে। তবে বড় পার্সেল এখনো সরাসরি বাসাবাড়িতে পৌঁছে দেওয়া হচ্ছে না। গ্রাহককে সংশ্লিষ্ট পোস্ট অফিস থেকে পার্সেল সংগ্রহ করতে হয়। পণ্য পৌঁছানোর পর ফোন ও এসএমএসের মাধ্যমে গ্রাহককে জানিয়ে দেওয়া হয়। ভবিষ্যতে হোম ডেলিভারির সুযোগ তৈরি হবে।
ডাক বিভাগের কর্মকর্তাদের দেওয়া হিসাবে, স্পিড পোস্টের সবচেয়ে বড় আকর্ষণের সাশ্রয়ী খরচ। ডাক বিভাগের অবকাঠামো ও বিদ্যমান পরিবহনব্যবস্থাকে ব্যবহার করে বেসরকারি কুরিয়ারের তুলনায় অনেক কম খরচে পণ্য পরিবহন করা সম্ভব হচ্ছে। প্রথম এক কেজির জন্য মাত্র ১০ টাকা। এরপর প্রতি কেজিতে পাঁচ টাকা করে। অর্থাৎ পাঁচ কেজির একটি পার্সেল পাঠাতে খরচ মাত্র ৩০ টাকা। ২০ কেজির পণ্য পাঠাতে খরচ ১০৫ টাকা। এসএমএস ও ফোন নোটিফিকেশনের জন্য অতিরিক্ত এক টাকা নেওয়া হয়।

বর্তমানে সাধারণভাবে  সর্বোচ্চ ৩০ কেজি পর্যন্ত পার্সেল গ্রহণ করা হচ্ছে। পাঁচ কেজির একটি পার্সেল বেসরকারি কুরিয়ারে পাঠাতে যেখানে কমবেশি ১৩০ টাকা খরচ হয়, সেখানে একই পণ্য স্পিড পোস্টে পাঠাতে খরচ মাত্র ৩০ টাকা। অর্থাৎ প্রতি কেজিতে স্পিড পোস্টের খরচ প্রায় ছয় টাকা। বেসরকারি কুরিয়ারে একই হিসাবে তা প্রায় ২৬ টাকা। খরচের এই বিশাল পার্থক্য স্পিড পোস্টকে জনপ্রিয় করে তুলছে।

সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা জানান, আগামী দিনে বিমানবন্দর থেকে প্রবাসীদের লাগেজ সংগ্রহ করে নির্দিষ্ট ঠিকানায় পৌঁছে দেওয়ার পরিকল্পনাও রয়েছে। বেশির ভাগ এলাকায় ২৪ ঘণ্টার মধ্যে লাগেজ পৌঁছে দেওয়ার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। এ ছাড়া আগামী দিনে ই-কমার্স ব্যবসায়ীদের জন্য ক্যাশ অন ডেলিভারি (সিওডি) চালুর পরিকল্পনা রয়েছে। কারণ অনলাইনে অল্প দামের পণ্যের ক্ষেত্রে ডেলিভারি চার্জ অনেক সময় পণ্যের মূল্যের কাছাকাছি হয়ে যায়। ডাক বিভাগের কম খরচের সেবা সেই বাধা কমিয়ে দিতে পারে।

ডাক বিভাগের অতিরিক্ত মহাপরিচালক (ডাক সার্ভিস) মো. জাকির হাসান নূর জানান, আগামী দুই মাসের মধ্যে সিওডি সেবা চালুর পরিকল্পনা রয়েছে। এটি চালু হলে অনলাইন ব্যবসায়ীরা ডাক বিভাগের মাধ্যমে পণ্য পাঠানোর পাশাপাশি গ্রাহকের কাছ থেকে পণ্যের মূল্যও সংগ্রহ করতে পারবেন। ফলে ডাক বিভাগ শুধু পরিবহন সেবা নয়, ই-কমার্সের একটি পূর্ণাঙ্গ লজিস্টিক অংশীদারে পরিণত হওয়ার সুযোগ পাবে।

বর্তমানে স্পিড পোস্ট সব উপজেলায় পৌঁছালেও ইউনিয়ন পর্যায়ে পূর্ণাঙ্গভাবে চালু হয়নি। ডাক বিভাগের পরিকল্পনা অনুযায়ী, ধীরে ধীরে দেশের প্রায় ১০ হাজার সরকারি ও অবিভাগীয় পোস্ট অফিসে স্পিড পোস্ট চালু করা হবে। আগামী ছয় মাসের মধ্যে সব পোস্ট অফিসকে এই নেটওয়ার্কে যুক্ত করার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। আর সেই লক্ষ্য অর্জনে ভবিষ্যতে প্রয়োজন অনুযায়ী নিজস্ব যানবাহন কেনার পাশাপাশি ভাড়ায় যানবাহন নিয়ে পরিবহন সক্ষমতা বাড়ানোর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।

সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন, স্পিড পোস্টের চাহিদা তৈরি হয়েছে। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমেও ব্যবহারকারীদের ইতিবাচক প্রতিক্রিয়া দেখা যাচ্ছে। ইউনিয়নভিত্তিক ডাকঘরের বিশাল নেটওয়ার্ককে পুরোপুরি কাজে লাগাতে পারলে বাংলাদেশ ডাক বিভাগ দেশের সবচেয়ে বড় কুরিয়ার নেটওয়ার্কে পরিণত হতে পারে। অর্থাৎ মোবাইল ফোন ও ইন্টারনেটের বিস্তারে চিঠির ব্যবহার কমে যাওয়ায় ডাকঘরের ব্যস্ততা কমলেও ই-কমার্সের বিস্তারের যুগে স্পিড পোস্টে সেই ডাকঘর আবারও প্রাণ ফিরে পাচ্ছে।

Check Also

‘অসংখ্য ডিসেম্বর আসবে-যাবে, কিন্তু শেখ হাসিনা…’

প্রধানমন্ত্রীর রাজনৈতিক সহকারী রাশেদ খাঁন বলেছেন, অসংখ্য ডিসেম্বর আসবে-যাবে, কিন্তু শেখ হাসিনা দেশে ফিরবেন না। …

Premium SEO Backlinks
Premium SEO Backlinks