কুমিল্লায় সপ্তম শ্রেণির শিক্ষার্থী জান্নাতুল তাজমিনের (১৫) মরদেহ উদ্ধারের ঘটনাস্থলে মিলেছে দৌড়াদৌড়ি ও ধস্তাধস্তির চিহ্ন। বৃহস্পতিবার (৮ অক্টোবর) সকালে লালমাই উপজেলার জগতপুর গ্রামের একটি ধানক্ষেত থেকে তার মরদেহ উদ্ধার করে পুলিশ। ঘটনাস্থলের অন্তত চার থেকে পাঁচটি ধানক্ষেতে এলোমেলো হয়ে আছে ধানগাছ। পাশে পড়ে ছিল একটি পরিত্যক্ত সিএনজিচালিত অটোরিকশা। স্থানীয়দের ধারণা, প্রাণ বাঁচাতে পালানোর চেষ্টা করেছিল তাজমিন। তবে কীভাবে তার মৃত্যু হয়েছে, তা তদন্ত করছে পুলিশ।
বৃহস্পতিবার সরেজমিনে দেখা যায়, লালমাই উপজেলার জগতপুর গ্রামের ভেতর দিয়ে চলে গেছে একটি নির্জন পাকা সড়ক। সড়কের দুই পাশে বিস্তৃত ফসলি জমি। সড়কের মধ্যবর্তী স্থানের দুই পাশে অন্তত চার থেকে পাঁচটি ধানক্ষেতে দৌড়াদৌড়ি ও ধস্তাধস্তির চিহ্ন রয়েছে। ক্ষেতের মাথা উঁচু করে থাকা ধানগাছগুলো এলোমেলো হয়ে আছে। সড়কের এক পাশে ধানক্ষেতে পড়ে ছিল একটি সিএনজিচালিত অটোরিকশা। পরে স্থানীয়রা সেটি টেনে সড়কের ওপর তোলেন।
স্থানীয় বাসিন্দা রুহুল আমিন বলেন, সকালে আশপাশের মানুষের কাছে শুনতে পান ধানক্ষেতে একটি সিএনজি পড়ে আছে। খবর পেয়ে ঘটনাস্থলে গিয়ে তিনি বিষয়টি দেখতে পান। সিএনজিটির ২০ থেকে ৩০ গজ দূরে একটি ভ্যানিটি ব্যাগ পড়ে ছিল। আশপাশের ধানক্ষেতগুলোতে ধস্তাধস্তি ও দৌড়াদৌড়ির চিহ্নও দেখতে পান তিনি। সেই চিহ্ন অনুসরণ করে সামনে একটি ধানক্ষেতে গিয়ে এক নারীর মরদেহ পড়ে থাকতে দেখেন।
রুহুল আমিন বলেন, লাশের মাথা কাদায় গাড়ানো ছিল। পুরো শরীর বস্ত্রহীন ছিল। গলায় গামছা প্যাঁচানো ছিল। পরে দলে দলে মানুষ মরদেহ দেখতে আসতে থাকলে তিনি একটি গামছা দিয়ে শরীর ঢেকে দেন। এ সময় জাতীয় জরুরি সেবা ৯৯৯ নম্বরে ফোন করে পুলিশকে খবর দেন। পরে পুলিশ ঘটনাস্থলে এসে মরদেহ উদ্ধার করে।
স্থানীয়রা জানান, বৃহস্পতিবার সকালে কাঁচিকাটা-হরিশ্চর পাকা সড়কের জগতপুর উত্তরপাড়া এলাকার মানুমুড়া সংলগ্ন স্থানে একটি সিএনজি পরিত্যক্ত অবস্থায় পড়ে থাকতে দেখেন তারা। এতে তাদের সন্দেহ হয়। পরে সড়ক থেকে প্রায় ৫০ গজ দূরে ফসলি জমিতে গিয়ে আইলের পাশে এক কিশোরীর মরদেহ দেখতে পান। মরদেহটির গলায় গামছা প্যাঁচানো ছিল। মুখ মাটিতে চেপে রাখা অবস্থায় ছিল। খবর পেয়ে লালমাই থানা পুলিশ ঘটনাস্থলে গিয়ে মরদেহ উদ্ধার করে। পরে সিআইডি ও পিবিআইসহ পুলিশের একাধিক দল ঘটনাস্থল পরিদর্শন করে বিভিন্ন আলামত সংগ্রহ করে।
ঘটনাস্থলের চিত্র দেখে স্থানীয়দের ধারণা, তাজমিনকে হত্যার আগে ধস্তাধস্তি হয়ে থাকতে পারে। স্থানীয় বাসিন্দা মো. মুহিন বলেন, যারাই মেয়েটিকে মেরেছে, তারা মেয়েটিকে অনেক কষ্ট দিয়ে মেরেছে। সেটি ধানক্ষেতের দিকে তাকালেই বুঝা যায়। মেয়েটি সম্ভবত নিজের জীবন বাঁচানোর জন্য অনেক চেষ্টা করেছিল। কিন্তু পেরে ওঠেনি।
তিনি আরও বলেন, কিন্তু একটা জিনিস বুঝে উঠতে পারছি না, সিএনজিটি কেন এভাবে ধানক্ষেতে পড়েছিল। সিএনজিটি যদি হত্যাকারীদের হয়ে থাকে, তবে তারা সেটি ফেলে গেল কেন, কীভাবেই বা তারা ঘটনাস্থল থেকে গেল? যা-ই হোক, পুলিশি তদন্তে সব বের হবে বলে আশা করছি।
লাশের মাথা কাদায় গাড়ানো ছিল। পুরো শরীর বস্ত্রহীন ছিল। গলায় গামছা প্যাঁচানো ছিল। পরে দলে দলে মানুষ মরদেহ দেখতে আসতে থাকলে তিনি একটি গামছা দিয়ে শরীর ঢেকে দেন। এ সময় জাতীয় জরুরি সেবা ৯৯৯ নম্বরে ফোন করে পুলিশকে খবর দেন। পরে পুলিশ ঘটনাস্থলে এসে মরদেহ উদ্ধার করে।—স্থানীয় বাসিন্দা রুহুল আমিন
এদিকে পরিবার সূত্রে জানা যায়, গত ৪ অক্টোবর বাসা থেকে বের হওয়ার সময় তাজমিন এক বান্ধবীর বাড়িতে যাওয়ার কথা জানিয়েছিল। পরে সে ওই বান্ধবীর সঙ্গে কক্সবাজারে ঘুরতে যায়। সেখান থেকে বুধবার রাতে কুমিল্লার উদ্দেশে রওনা হয় সে। রাতে বাবা আবদুল আলীম মেয়ের মোবাইল ফোনে একাধিকবার কল করলেও সে ফোন রিসিভ করেনি। মেয়ের খোঁজে তিনি কুমিল্লার বাসা থেকে বের হন। পরে ভোরে লালমাই থানায় গিয়ে মেয়ের মরদেহ শনাক্ত করেন।
নিহতের বাবা আবদুল আলীম জানান, গত ৪ অক্টোবর তার একমাত্র মেয়ে তাজমিন কুমিল্লা নগরীর রেসকোর্সের ধানমন্ডি এলাকার ভাড়া বাসা থেকে বের হয়। সে শহরের এক বান্ধবীর বাসায় যাওয়ার কথা বলেছিল। পরে বান্ধবীর সঙ্গে কক্সবাজারে যায়।
আবদুল আলীম জানান, বুধবার রাত ২টার দিকে কক্সবাজার থেকে কুমিল্লা বিশ্বরোড এলাকার হোটেল নূরজাহানের সামনে এসে নামার পর মেয়ের সঙ্গে তার ফোনে কথা হয়। এরপর আর যোগাযোগ করতে না পেরে সকালে মেয়ের মোবাইল ফোনের অবস্থান শনাক্তের চেষ্টা করেন তিনি। পরে জানতে পারেন, ফোনটির অবস্থান লালমাই থানা এলাকায়। সেই সূত্র ধরে খোঁজ করতে গিয়ে জগতপুর এলাকার ফসলি জমি থেকে মেয়ের মরদেহ উদ্ধারের খবর পান।
লালমাই থানার অফিসার ইনচার্জ (ওসি) মো. মিজানুর রহমান বলেন, গলায় গামছা পেঁচানো অবস্থায় ১৫ বছর বয়সী এক কিশোরীর মরদেহ উদ্ধার করা হয়েছে। ঘটনাস্থল থেকে একটি পরিত্যক্ত সবুজ রঙের সিএনজিও উদ্ধার করা হয়েছে। প্রথমে মরদেহটি অজ্ঞাত ছিল। পরে পরিচয় শনাক্ত করা হয়। মরদেহ ময়নাতদন্তের জন্য কুমিল্লা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে পাঠানো হয়েছে। ঘটনাটি কীভাবে ঘটেছে এবং এর সঙ্গে কারা জড়িত, তা উদঘাটনে পুলিশের একাধিক দল কাজ করছে।
কুমিল্লার সিনিয়র সহকারী পুলিশ সুপার (সদর দক্ষিণ সার্কেল) মোস্তাইন বিল্লাহ্ বলেন, সকালে স্থানীয়দের মাধ্যমে খবর পেয়ে ঘটনাস্থলে গিয়ে মরদেহ উদ্ধার ও সিএনজি চালিত অটোরিকশাটিও জব্দ করা হয়েছে। নিহতের শরীরে কোনো আঘাতের চিহ্ন ছিল না। গলায় গামছা পেচানো ছিল। ধারণা করা হচ্ছে, শ্বাসরোধ করেই তাকে হত্যা করা হয়েছে। তবে, ময়নাতদন্তের প্রতিবেদন এলে হত্যার বিবরণ জানা যাবে।
পুলিশের এই কর্মকর্তা বলেন, ঘটনাস্থল থেকে জব্দ করা সিএনজি চালিত অটোরিকশাটি রেজিস্ট্রেশনকৃত। আমরা সেটির সূত্র ধরে এগুচ্ছি। ঘটনার রহস্য উদঘাটনে পুলিশের একাধিক ইউনিট কাজ করছে।
এদিকে, নিহত তাজমিনের মরদেহ নিয়ে যশোরে গ্রামের বাড়ি পৌঁছেছেন তার স্বজনরা। ময়নাতদন্ত শেষে সন্ধ্যা ৭টার দিকে কুমিল্লা থেকে যশোরের উদ্দেশে রওনা দেন তারা। যশোর সদর উপজেলার ছাতিয়ানতলা এলাকায় নিজ গ্রামের পারিবারিক কবরস্থানে তাকে দাফন করা হবে বলে পরিবারের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে।
জান্নাতুল তাজমিন যশোর সদর উপজেলার ছাতিয়ানতলা গ্রামের আব্দুল আলিমের মেয়ে। সে কুমিল্লা নগরীর ফরিদা বিদ্যায়তন স্কুলের সপ্তম শ্রেণির শিক্ষার্থী ছিল। চলতি বছরের ফেব্রুয়ারি থেকে সে আর স্কুলে যায়নি বলে জানিয়েছে স্কুল কর্তৃপক্ষ। তার বাবা আব্দুল আলিম রেনেটা ওষুধ কোম্পানির কুমিল্লা রিজিয়নে চাকরি করেন। তারা কুমিল্লা নগরীর রেসকোর্স এলাকায় একটি ভাড়া বাসায় বসবাস করতেন। এ ঘটনায় নিহত তাজমিনের বাবা আব্দুল আলীম বাদী হয়ে লালমাই থানায় অজ্ঞাত আসামিদের বিরুদ্ধে একটি হত্যা মামলা দায়ের করেছেন। হত্যাকাণ্ডের কারণ ও এর সঙ্গে জড়িত ব্যক্তিদের শনাক্ত করতে তদন্ত চালাচ্ছে পুলিশ।
চাকরির বাজার Jobs and Career Solution