দেড় বছর আগে অপ্রতিমের মায়ের হাতে গাঁজাসহ আটক হয়েছিল আসামি ফাহাদ

কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ড. নাহিদা বেগমের ১৩ বছর বয়সী সন্তান ইশায়াত শাহরিয়ার অপ্রতিম হত্যাকাণ্ডের রহস্যে নতুন মোড় নিয়েছে। আলোচিত এই হত্যাকাণ্ডের অন্যতম গ্রেপ্তার আসামি মোজাম্মেল হোসেন ফাহাদ প্রায় দেড় বছর আগে কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাস থেকেই ড. নাহিদার নেতৃত্বে গাঁজাসহ আটক হয়েছিল। তখনকার সেই অভিযানের প্রতিশোধ বা শত্রুতার জেরেই তার ছেলেকে টার্গেট করা হয়েছে কি না—এমন গুরুতর প্রশ্ন তুলেছেন শোকাহত মা।

২০২৫ সালের ৬ ফেব্রুয়ারি রাতে বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসের লালন চত্বর থেকে গাঁজাসহ যে সাত কিশোরকে আটক করা হয়েছিল, তাদের মধ্যে ফাহাদও ছিল। তখন ড. নাহিদা বেগম বিশ্ববিদ্যালয়ের ভারপ্রাপ্ত প্রক্টরের দায়িত্ব পালন করছিলেন। সেই অভিযানে সহকারী প্রক্টর মাহমুদুল হাসান রাহাত ও মুতাসিম বিল্লাহ উপস্থিত ছিলেন এবং প্রশাসনের উপস্থিতিতে জব্দ করা মাদক ধ্বংস করা হয়েছিল।

তৎকালীন সময়ে ড. নাহিদা সংবাদমাধ্যমকে জানিয়েছিলেন, প্রক্টোরিয়াল টিমের নিয়মিত অভিযানের অংশ হিসেবে আটক সাতজনের বয়স ১৮ বছরের কম হওয়ায় তাদের সংশোধন ও ভবিষ্যতের কথা চিন্তা করে অভিভাবকদের কাছ থেকে মুচলেকা নিয়ে ছেড়ে দেওয়া হয়েছিল। সহকারী প্রক্টর মুতাসিম বিল্লাহও নিশ্চিত করেছেন যে আটক কিশোরদের মধ্যে ফাহাদ ছিল এবং পরিবারের লোকজন এসে মুচলেকা দিয়ে তাকে ছাড়িয়ে নিয়েছিলেন। তবে ফাহাদের মা জুলি আক্তার ওই ঘটনায় ছেলের উপস্থিতির কথা অস্বীকার করেছেন।

আসামি মোজাম্মেল হোসেন ফাহাদ কুমিল্লা সিটি করপোরেশনের ২৪ নম্বর ওয়ার্ডের সালমানপুর (মেম্বার বাড়ি) এলাকার অটোরিকশাচালক মোমিন হোসেন ও জুলি আক্তারের ছেলে। সে ময়নামতি কারিগরি স্কুল অ্যান্ড কলেজের নবম শ্রেণির শিক্ষার্থী ছিল। চাঞ্চল্যকর তথ্য হলো, চলতি মাসের ২ তারিখে অপ্রতিমের বাবা কে এম ফিরোজ শাহরিয়ারের ইলেকট্রিক প্রতিষ্ঠানেও চাকরি নিয়েছিল এই ফাহাদ। অপ্রতিমের বাবা নিশ্চিত করেছেন, দেড় বছর আগে ক্যাম্পাসে গাঁজাসহ আটক হওয়া কিশোরদের একজনই এই ফাহাদ।

গত শুক্রবার (১৮ সেপ্টেম্বর) কুমিল্লার কোটবাড়ির গন্ধমতী এলাকার ভাড়া বাসা থেকে বের হয়ে নিখোঁজ হয় কুমিল্লা বর্ডার গার্ড পাবলিক স্কুলের সপ্তম শ্রেণির ছাত্র অপ্রতিম। পরদিন শনিবার দুপুরে সদর দক্ষিণ উপজেলার বিজয়পুর ইউনিয়নের সানন্দা গ্রামের লালমাই পাহাড়ের নির্জন জঙ্গল থেকে তার নিথর মরদেহ উদ্ধার করা হয়। এ ঘটনায় গ্রেপ্তার চার আসামিকে রিমান্ডে নেওয়া হয়েছে এবং ফাহাদসহ তিনজন ইতোমধ্যে আদালতে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়েছে।

এদিকে মঙ্গলবার (২২ সেপ্টেম্বর) কুমিল্লা জেলা আইনজীবী সমিতির নেতারা শোকসন্তপ্ত পরিবারের সদস্যদের সমবেদনা জানাতে অপ্রতিমের বাসায় যান। সেখানে ক্ষোভ ও কান্নায় ভেঙে পড়েন ড. নাহিদা বেগম। তিনি অভিযোগ করেন, ‘আমার সন্তানকে জড়িয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের বিভিন্ন আইডি থেকে অপপ্রচার চালানো হচ্ছে। আমার নিষ্পাপ দুধের শিশুকে অপরাধী বানানোর চেষ্টা করা হলে আমি তা কখনোই মেনে নেব না। আমি শুধু আমার ছেলের বিচার চাই না; যারা এই নৃশংস কাজ করেছে, তারা জেল থেকে বের হলে আরও কত শিশুর জীবন কেড়ে নেবে, তা নিয়েও আমি শঙ্কিত।’

ড. নাহিদা আরও বলেন, ‘২০২৫ সালের শুরুতে ভারপ্রাপ্ত প্রক্টরের দায়িত্ব পালনকালে ক্যাম্পাসে বহু মাদকসেবী ও মাদক কারবারিকে ধরে আমি পুলিশের হাতে তুলে দিয়েছি। সেই ঘটনার প্রতিশোধ হিসেবে যদি আমার সন্তানকে টার্গেট করা হয়ে থাকে, তবে তা কোনোভাবেই মেনে নেওয়া যায় না। আমার কোনো ত্রুটি থাকলে প্রশাসন আমাকে শাস্তি দিক। কিন্তু মাদক কারবারিদের বিরুদ্ধে অবস্থান নেওয়ার কারণে আমার নিষ্পাপ বাচ্চাকে কেন মরতে হলো? তাকে ওদের দলের বানিয়ে প্রমাণের যে চেষ্টা চলছে, তা সম্পূর্ণ মিথ্যা।’

পরিবারের সঙ্গে সাক্ষাৎকালে উপস্থিত ছিলেন কুমিল্লার জেলা ও দায়রা জজ আদালতের সরকারি কৌঁসুলি (পিপি) কাইমুল হক রিংকু, সরকারি আইন কর্মকর্তা (জিপি) তারেক আবদুল্লাহ, কুমিল্লা জেলা আইনজীবী সমিতির সভাপতি শহীদ উল্লাহ, সাধারণ সম্পাদক মাহাবুবুল হক খন্দকার এবং সাবেক সভাপতি শরীফুল ইসলাম।

Check Also

পরীক্ষা না দিয়েই মেলে ফল, ফেল করেও এসএসসির রেজাল্ট জিপিএ-৫!

কখনো অকৃতকার্য হয়েও জিপিএ-৫, আবার কখনো পরীক্ষায় অংশগ্রহণ না করেই সর্বোচ্চ ফল লাভ—নতুন কোনো ঘটনা …

Premium SEO Backlinks
Premium SEO Backlinks