৩১ হাজার টাকার বিনিময়ে শিশুকে বিক্রি করেছিলেন বাবা, দুই মাস পর উদ্ধার করল পুলিশ

গাইবান্ধায় মাদকের টাকা জোগাড়ের জন্য নিজের কোলের ১১ মাসের শিশুকন্যাকে মাত্র ৪০ হাজার টাকায় বিক্রি করে দিয়েছিল এক বাবা। ওই টাকার মধ্যে মধ্যস্থতাকারী দালাল ৯ হাজার টাকা নিয়ে নেওয়ার পর বাবার হাতে এসেছিল মাত্র ৩১ হাজার টাকা।

এমনই এক চাঞ্চল্যকর ঘটনায় দীর্ঘ দুই মাসের বেশি সময় পর অভিযান চালিয়ে বিক্রীত শিশুটিকে অক্ষত অবস্থায় উদ্ধার করেছে জেলা গোয়েন্দা পুলিশ (ডিবি)। একই সঙ্গে এ চক্রের সঙ্গে জড়িত ৩ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে।

পুলিশ সূত্রে জানা যায়, গোপন তথ্যের ভিত্তিতে রবিবার (২০ সেপ্টেম্বর) সকাল ৯টার পর গাইবান্ধার সাদুল্লাপুর উপজেলার সাহারবাজার এলাকা থেকে প্রথমে শিশুটির বাবা হামিদুল মিয়াকে গ্রেপ্তার করা হয়। এরপর হামিদুলের দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে একই দিন বিকেল সাড়ে ৫টার দিকে রংপুরের পীরগঞ্জ উপজেলার রায়পুর ইউনিয়নের ছোট ওমরপুর এলাকায় অভিযান চালানো হয়। সেখান থেকে তার শ্বশুরবাড়ি থেকে ঘটনার সহযোগী ও বাসের হেলপার মজিদকে আটক করা হয়।

পুলিশ জানায়, এরপর মজিদের দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে গাইবান্ধার ফুলছড়ি উপজেলার মদনের পাড়া এলাকা থেকে আটক করা হয় চক্রের আরেক সহযোগী মোরশেদাকে। আটক তিনজনকে জিজ্ঞাসাবাদের পর পাওয়া তথ্যের ভিত্তিতে ফুলছড়ির মদনের পাড়া ছলের মোড় এলাকার সোলেমান চৌকিদারের বাড়িতে অভিযান চালায় ডিবি পুলিশ। সেখান থেকেই রাত সাড়ে ৯টার দিকে শিশুকন্যা ফাতেমা আক্তার জান্নাতকে অক্ষত অবস্থায় উদ্ধার করা হয়। উদ্ধারের পর রাত ১০টায় শিশুটিকে আনুষ্ঠানিকভাবে তার মা রুমানা আক্তারের কাছে হস্তান্তর করা হয়।

জেলা গোয়েন্দা পুলিশের (ডিবি) অফিসার ইনচার্জ (ওসি) আব্দুল মোত্তালিব সরকার জানান, শিশু বিক্রির খবর পেয়ে দ্রুত অভিযান চালিয়ে শিশুটিকে উদ্ধার ও জড়িত তিনজনকে আটক করা সম্ভব হয়েছে। তিনি বলেন, গোপন তথ্যের ভিত্তিতে অভিযান শুরু করে প্রথমে বাবা হামিদুলকে গ্রেপ্তার করা হয়। তার দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে অন্যদের গ্রেপ্তার এবং সবশেষে শিশুটিকে উদ্ধার করা হয়। এ ঘটনায় জড়িতদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণের প্রক্রিয়া চলমান রয়েছে। তিনি আরও জানান, শিশুটিকে কীভাবে ৩১ হাজার টাকায় হস্তান্তর করা হয়েছিল এবং এ ঘটনায় আরও কেউ জড়িত কি না, তা তদন্ত করা হচ্ছে।

শিশুটির মা রুমানা আক্তার জানান, গত ১৭ জুলাই বিকেলে হামিদুল গাইবান্ধা পৌরসভার ৩ নম্বর ওয়ার্ডের দক্ষিণ ধানঘড়া এলাকায় শ্বশুরবাড়িতে আসেন। ফাতেমাকে জুস কিনে দেওয়ার কথা বলে কোলে নিয়ে বাইরে যান, এরপর আর ফেরেননি। ঘটনার দুই দিন পর ফোন করে মেয়েকে ফেরত দেওয়ার শর্তে ১০ হাজার টাকা দাবি করেন হামিদুল। টাকা না দিলে শিশুটিকে বিক্রি করে দেওয়ার হুমকিও দেন। পরে জানা যায়, শিশুটিকে ৩১ হাজার টাকায় বিক্রি করা হয়েছিল। ঘটনার পর হামিদুলের মুঠোফোন বন্ধ পাওয়া যায়। মেয়ের সন্ধান না পেয়ে রুমানা থানায় অভিযোগ করেন এবং পরে আদালতেরও আশ্রয় নেন। তখন তিনি বলেছিলেন, আমি কোনো কিছু চাই না, শুধু আমার সন্তানকে ফিরে চাই। আমার সন্তান কোথায় আছে, কী অবস্থায় আছে কিছুই জানি না। ডিবি পুলিশের অভিযানে শিশুটি উদ্ধার হওয়ায় মায়ের দীর্ঘ প্রতীক্ষার অবসান ঘটেছে।

পারিবারিক ও স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, ২০২৪ সালের জুলাইয়ে হামিদুলের সঙ্গে রুমানার বিয়ে হয়। বিয়ের কিছুদিন পর থেকেই মাদকের টাকার জন্য স্ত্রীকে শারীরিক নির্যাতন করতেন হামিদুল। সন্তান জন্মের পর নির্যাতন বেড়ে গেলে রুমানা মেয়েকে নিয়ে বাবার বাড়িতে আশ্রয় নেন। স্বজনদের অভিযোগ, মাদকের অর্থ জোগাড় করতেই হামিদুল নিজের কোলের সন্তানকে ব্যবহার করেছেন। স্থানীয় বাসিন্দারাও তার মাদকাসক্তির বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন।

এর আগে শিশুটির নানি রোশনা বেগম বলেছিলেন, আমরা দিনমজুর ও দরিদ্র পরিবার। হামিদুলের দাবি করা টাকা দেওয়ার সামর্থ্য আমাদের ছিল না। নাতনিকে জীবিত ও সুস্থ অবস্থায় ফিরে পেতে তাই প্রশাসনের জরুরি হস্তক্ষেপ চেয়েছিলাম।

অবশেষে দীর্ঘ দুই মাসের বেশি সময় পর শিশুটি উদ্ধারের খবর ছড়িয়ে পড়লে স্বজনদের মধ্যে স্বস্তি ফিরে আসে। মেয়েকে ফিরে পাওয়ার খবরে আবেগাপ্লুত হন মা রুমানা। এদিকে এই ঘটনা মাদকাসক্তির ভয়াবহতা এবং শিশু নিরাপত্তা নিয়ে নতুন করে উদ্বেগ সৃষ্টি করেছে।

স্থানীয়রা বলছেন, মাদকাসক্ত ব্যক্তিদের কঠোরভাবে মনিটরিং করা হলে এমন নৃশংস ঘটনা প্রতিরোধ করা সম্ভব হতো। পুলিশের তদন্ত অব্যাহত থাকায় এ ঘটনার আরও তথ্য জানা যাবে বলে আশা করা হচ্ছে।