সাবেক আইজিপি বেনজীর আহমেদ কীভাবে দুবাইয়ে জামিন পেলেন এবং তাকে বাংলাদেশে ফিরিয়ে বিচারের মুখোমুখি করতে সরকার কী ব্যবস্থা নিচ্ছে, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীকে তা দ্রুত জানাতে বলেছে জাতীয় সংসদ।
মঙ্গলবার জাতীয় সংসদে বেনজীরকে নিয়ে এক ঘণ্টা ৪০ মিনিট আলোচনার শেষে স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদ এ প্রস্তাব ভোটে দেন। কণ্ঠভোটে তা গৃহীত হয়।
স্পিকার বলেন, বেনজীর কীভাবে দুবাইয়ে জামিন পেলেন, তা স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীকে ‘যথাশিগগিরই’ সংসদকে জানাতে হবে। তাকে বাংলাদেশে ফিরিয়ে বিচারের মুখোমুখি করতে সরকার কী ব্যবস্থা নিচ্ছে, সে বিষয়েও সংসদ সদস্যদের অবহিত করতে হবে।
এর আগে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ বলেন, বেনজীরকে ফেরাতে বাংলাদেশ নির্ধারিত ৩০ দিনের সময়সীমার অপেক্ষা না করে গ্রেপ্তারের চার দিনের মাথায় সংযুক্ত আরব আমিরাতকে আনুষ্ঠানিক প্রত্যর্পণ অনুরোধ পাঠিয়েছে।
বাংলাদেশ ও সংযুক্ত আরব আমিরাতের মধ্যে দ্বিপক্ষীয় প্রত্যর্পণ চুক্তি নেই। তাই দেশটির অভ্যন্তরীণ আইন ও পারস্পরিক সহযোগিতার নীতিতে প্রক্রিয়াটি চলছে বলে জানান তিনি।
আওয়ামী লীগ আমলের শেষ দিকে ২০২৪ সালের মার্চে পুলিশের সাবেক মহাপরিদর্শক বেনজীর আহমেদের ‘দুর্নীতির খবর’ সংবাদমাধ্যমে আসার পর হাই কোর্ট তার বিরুদ্ধে তদন্তের নির্দেশ দেয়। দুর্নীতি দমন কমিশন জানায়, বিষয়টি তারা অনুসন্ধান শুরু করেছে।
পরে দুদকের আবেদনে বেনজীর, তার স্ত্রী ও তিন মেয়ের স্থাবর সম্পদ ক্রোকের আদেশ দেয় ঢাকা মহানগরের জ্যেষ্ঠ বিশেষ জজ আদালত। তাদের নামে থাকা ব্যাংক হিসাব এবং বিভিন্ন কোম্পানিতে তাদের নামে থাকা শেয়ারও অবরুদ্ধ করার আদেশ আসে।
এর মধ্যেই খবর আসে, বেনজীর তার স্ত্রী-কন্যাদের নিয়ে আগেই দেশত্যাগ করেছেন।
দুর্নীতি মামলায় অভিযুক্ত বেনজীর আহমেদকে ধরতে ২০২৫ সালের ১১ এপ্রিল আন্তর্জাতিক পুলিশ সংস্থা ইন্টারপোলের মাধ্যমে রেড নোটিস জারি করা হয়েছিল।
গত ১২ জুন সংযুক্ত আরব আমিরাত কর্তৃপক্ষ ই-মেইলের মাধ্যমে বাংলাদেশ সরকারকে বেনজীরের গ্রেপ্তারের বিষয়টি জানায়।
গেল ৩০ জুলাই তিনি সেখানে জামিনে মুক্তি পান। ২ অগাস্ট দেশের কয়েকটি সংবাদমাধ্যম এ খবর দেয়।
যেভাবে আলোচনার সূত্রপাত
কার্যপ্রণালী বিধির ১৪৭ বিধিতে ঢাকা-১৪ আসনের জামায়াতে ইসলামীর সংসদ সদস্য মীর আহমাদ বিনকাসেম বেনজীর আহমেদের বিষয়ে একটি সাধারণ প্রস্তাব আনেন।
মীর আহমাদ বিনকাসেম বলেন, বেনজীর র্যাবের মহাপরিচালক থাকার সময় তিনি নিজে গুমের শিকার হয়েছিলেন।
বেনজীরের বিরুদ্ধে গুম, মানবতাবিরোধী অপরাধ, অর্থ পাচার ও দুর্নীতির অভিযোগ তুলে তাকে দেশে ফেরানোর প্রক্রিয়া নিয়ে সরকারের কাছে জবাব চান তিনি।
তার প্রস্তাবে বলা হয়, দুবাইয়ে বেনজীর গ্রেপ্তার হওয়ার পর ১৪ জুন সংসদে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী তাকে দ্রুত দেশে ফিরিয়ে আনার আশ্বাস দিয়েছিলেন।
পরে তার জামিন পাওয়া এবং সেন্ট লুসিয়ায় চলে যাওয়ার খবরকে প্রত্যর্পণ প্রক্রিয়ার ‘গুরুতর ব্যর্থতা’ হিসেবে তুলে ধরেন জামায়াতের এই সংসদ সদস্য।
তিনি সরকারের নেওয়া পদক্ষেপের পূর্ণ বিবরণ সংসদে দেওয়ার পাশাপাশি পাঠানো নথিপত্রে কোনো আইনগত বা পদ্ধতিগত ত্রুটি ছিল কি না, তা পরীক্ষা করার দাবি জানান।
সরকারি চাকরিতে থাকা অবস্থায় বেনজীর কীভাবে একাধিক দেশের পাসপোর্ট পেয়েছেন, সেই অভিযোগের তদন্ত এবং দেশে-বিদেশে তার সম্পদ জব্দের অগ্রগতিও জানতে চান তিনি।
চার দিনের মাথায় অনুরোধ
জবাবে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, বেনজীরের বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা ও ইন্টারপোলের রেড নোটিস জারি, দুবাইয়ে গ্রেপ্তার হওয়ার তথ্য পাওয়া এবং তাকে প্রত্যর্পণের প্রক্রিয়ার বিষয়টি তুলে ধরেন।
তিনি বলেন, বাংলাদেশ ১৬ জুন, অর্থাৎ গ্রেপ্তারের চার দিনের মাথায় সংযুক্ত আরব আমিরাতের কেন্দ্রীয় কর্তৃপক্ষের কাছে আনুষ্ঠানিক প্রত্যর্পণ অনুরোধ পাঠায়।
“এক মাসের জায়গায় চার দিনে দিয়েছি,” বলেন তিনি।
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর ভাষ্য, প্রত্যর্পণ অনুরোধ পাঠাতে বাংলাদেশ দেরি করেছে, এমন ধারণা সঠিক নয়।
বাংলাদেশের অনুরোধ পাওয়ার পর ৮ জুলাই সংযুক্ত আরব আমিরাতের বিচার মন্ত্রণালয় আরও কিছু তথ্য ও নথি চায়।
এর মধ্যে ছিল পারস্পরিক সহযোগিতার নিশ্চয়তা, সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের আনুষ্ঠানিক বিবৃতি, মামলা ও দণ্ড কার্যকরের তামাদি সংক্রান্ত আইনি ব্যাখ্যা এবং গ্রেপ্তারি পরোয়ানার সত্যায়িত কপি।
এসব নথি প্রস্তুত করে ৪ অগাস্ট কূটনৈতিক চ্যানেলে সংযুক্ত আরব আমিরাতে পাঠানো হয় বলে জানান স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী।
এরপর ২২ অগাস্ট আরব আমিরাত কর্তৃপক্ষ মামলা দায়েরের তামাদি এবং দণ্ডের মেয়াদ উত্তীর্ণ হওয়ার বিধান নিয়ে আরও সুনির্দিষ্ট আইনি ব্যাখ্যা চায়। এসব তথ্য দেওয়ার সময়সীমা ২২ সেপ্টেম্বর।
সালাহউদ্দিন আহমদ বলেন, আইন ও বিচার বিভাগের মতামত ১ সেপ্টেম্বর এবং দুদকের মতামত ২ সেপ্টেম্বর পাওয়া গেছে। দুই মতামতের ভিত্তিতে একটি পূর্ণাঙ্গ জবাব তৈরি করা হয়েছে।
নথির সত্যায়ন ও আরবি অনুবাদ শেষে নির্ধারিত সময়ের মধ্যেই তা পাঠানো হবে, বলেন তিনি।
আইনি সেবা প্রতিষ্ঠান নিয়োগ
বেনজীরের প্রত্যর্পণ কার্যক্রমে আইনি সহায়তার জন্য সংযুক্ত আরব আমিরাতে একটি আইনি সেবা প্রতিষ্ঠান (ল ফার্ম) নিয়োগ করেছে বাংলাদেশ।
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, ৩০ জুলাই আবুধাবিতে বাংলাদেশ দূতাবাসের মাধ্যমে হামদান আল কাবি অ্যাডভোকেটস অ্যান্ড লিগ্যাল কনসালট্যান্টসকে নিয়োগ দেওয়া হয়।
বেনজীর জামিন পেয়েছেন বলে সংবাদমাধ্যমে খবর আসার পর এনসিবি ঢাকা ২ আগস্ট আবুধাবির জাতীয় কেন্দ্রীয় ব্যুরো-এনসিবিকে তার বিষয়ে সতর্কতা ও সীমান্ত পয়েন্টগুলোতে নজরদারি বজায় রাখার অনুরোধ করে।
পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমে জামিনের আদেশের সত্যায়িত কপি সংগ্রহ এবং প্রয়োজন হলে জামিন পুনর্বিবেচনা বা বাতিলের আইনি উদ্যোগ নেওয়ার কথাও জানান সালাহউদ্দিন।
সেন্ট লুসিয়ায় চলে গেছেন?
৩১ অগাস্ট ঢাকার এনসিবি বেনজীরের বর্তমান অবস্থান এবং তিনি সংযুক্ত আরব আমিরাতে রয়েছেন কি না, সে বিষয়ে আবুধাবির এনসিবির কাছে আনুষ্ঠানিক তথ্য চায়, বলেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী।
তিনি বলেন, বেনজীর সেন্ট লুসিয়ায় যাওয়ার খবর কোনো রাষ্ট্র বা বিদেশি কর্তৃপক্ষ এখন পর্যন্ত বাংলাদেশকে আনুষ্ঠানিকভাবে নিশ্চিত করেনি।
তিনি অন্য কোনো দেশে আছেন বলে আনুষ্ঠানিকভাবে শনাক্ত হলে সেই দেশের আইন, পারস্পরিক সহযোগিতার নীতি ও আন্তর্জাতিক আইনি কাঠামোর আওতায় তাকে গ্রেপ্তার ও দেশে ফিরিয়ে আনার উদ্যোগ নেওয়া হবে বলে তুলে ধরেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী।
পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী হুমায়ুন কবিরও বলেন, বেনজীর সেন্ট লুসিয়ায় চলে গেছেন বলে যে খবর এসেছে, তা বাংলাদেশ দূতাবাসের মাধ্যমে সংযুক্ত আরব আমিরাতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের কাছে যাচাই করা হয়েছে। কিন্তু তারা বেনজীরের দেশ ছাড়ার তথ্য আনুষ্ঠানিকভাবে নিশ্চিত করেনি।
পাসপোর্ট ও সম্পদের তদন্ত
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, বেনজীরের পাসপোর্ট জালিয়াতির অভিযোগে দুদক মামলা করেছে। ওই মামলায় বহিরাগমন ও পাসপোর্ট অধিদপ্তরের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদেরও আসামি করা হয়েছে। মামলাটি তদন্তাধীন।
বেনজীর ও তার পরিবারের সদস্যদের বিদেশে থাকা সম্পদের বিষয়ে সংশ্লিষ্ট দেশগুলোতে মিউচুয়াল লিগ্যাল অ্যাসিস্ট্যান্স অনুরোধ পাঠানো হয়েছে। প্রয়োজনীয় রেকর্ড ও প্রমাণ পাওয়া গেলে বিদেশে থাকা সম্পদ অবরুদ্ধ, জব্দ, বাজেয়াপ্ত বা পুনরুদ্ধারে ব্যবস্থা নেওয়া হবে, বলেন তিনি।
‘ভেরি আনফরচুনেট’
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, “বেনজীরের মত একজন কালপ্রিট, কুখ্যাত লোক নিয়ে এই মহান জাতীয় সংসদে আমাদের দীর্ঘক্ষণ আলোচনা করতে হচ্ছে। ভেরি আনফরচুনেট।”
আওয়ামী লীগের ‘ফ্যাসিবাদী শাসনের’ সময়ে গুম, বিচারবহির্ভূত হত্যা, নির্যাতন ও রাজনৈতিক নিপীড়নের প্রসঙ্গ টেনে সালাহউদ্দিন বলেন, এসবের ‘হাতিয়ার’ হিসেবে কাজ করা ব্যক্তিদের মধ্যে শেখ হাসিনার পর বেনজীরকে ‘নম্বর ওয়ান’ এবং এরপর সাবেক সেনা কর্মকর্তা জিয়াউল আহসানকে রাখা যায়।
জিয়াউল আহসানকে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের আওতায় আনা গেলেও বেনজীর আগেই দেশ ছেড়ে চলে গেছেন, বলেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী।
সরকারি ও বিরোধী দলের সদস্যদের ‘ফ্যাসিবাদবিরোধী’ প্রশ্নে ঐক্যবদ্ধ থাকার আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, “সংসদে তর্ক, বিতর্ক ও মতভেদ থাকতে পারে, কিন্তু ফ্যাসিবাদী, ফ্যাসিস্ট আওয়ামী লীগের প্রশ্ন যেখানেই আসবে, তার প্রতিরোধের জন্য আমরা সবাই ঐক্যবদ্ধ।”
জুলাই-আগস্টের গণঅভ্যুত্থানে যে ‘ফ্যাসিবাদবিরোধী ঐক্য’ গড়ে উঠেছিল, সেটিকে ধরে রাখার কথাও বলেন সালাহউদ্দিন।
‘বিশেষ সেল’ চান তাহের
বিরোধীদলীয় উপনেতা সৈয়দ আবদুল্লাহ মোহাম্মদ তাহের বিদেশে থাকা পলাতক অভিযুক্তদের দেশে ফেরাতে একটি ‘বিশেষ সেল’ গঠনের প্রস্তাব দেন।
তিনি বলেন, ওই সেলের কাজ হবে বেনজীরসহ বিদেশে অবস্থানরত পলাতকদের বিষয়ে তথ্য সংগ্রহ এবং তাদের দেশে ফেরানোর আইনি ও কূটনৈতিক প্রক্রিয়ায় মনোযোগ দেওয়া।
তাহের বলেন, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আগে সংসদে বেনজীরকে দেশে ফেরানোর আশ্বাস দিয়েছিলেন। পরে সেই প্রক্রিয়ার অগ্রগতি নিয়ে আরেকটি বিবৃতি দিলে এ নিয়ে অনেক প্রশ্নের উত্তর পাওয়া যেত।
বিদেশে পলাতক অন্য অভিযুক্তদের বিষয়েও একইভাবে সমন্বিত ব্যবস্থা নেওয়ার কথা বলেন তিনি।
‘জামিন মানেই প্রত্যর্পণ শেষ নয়’
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, কোনো ব্যক্তির জামিন পাওয়া মানেই প্রত্যর্পণ কার্যক্রম শেষ হয়ে যাওয়া নয়।
প্রত্যর্পণ একটি বিচারিক ও রাষ্ট্রীয় প্রক্রিয়া। সংশ্লিষ্ট দেশের কর্তৃপক্ষ ও আদালত অপরাধের প্রকৃতি, গ্রেপ্তারি পরোয়ানা, প্রমাণ এবং অন্যান্য আইনি শর্ত পরীক্ষা করে সিদ্ধান্ত নেয়।
এ কারণে আইনি ও বিচারিক ধাপ অতিক্রমে সময় লাগাকে সরকারের নিষ্ক্রিয়তা বা ব্যর্থতা বলা ঠিক হবে না বলে মন্তব্য করেন তিনি।
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর বক্তব্যের পর মীর আহমদ বিনকাসেম বলেন, সরকারের নেওয়া পদক্ষেপের বিবরণ পেলেও প্রত্যর্পণের নথিতে কোনো আইনি বা কারিগরি ত্রুটি ছিল কি না, কারা নথিতে সই করেছেন এবং কোন চ্যানেলে তা পাঠানো হয়েছে, সে বিষয়ে বিস্তারিত পাওয়া যায়নি।
“বিবরণ পেয়েছি, বিস্তারিত পাইনি,” বলেন তিনি।
এরপর স্পিকার প্রস্তাবটি ভোটে দেন। প্রস্তাব গৃহীত হওয়ার পর তিনি স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীকে বলেন, “যত শীঘ্র সম্ভব বেনজীর আহমদকে বাংলাদেশে ফিরিয়ে আনার জন্য কী ব্যবস্থা আপনি নিচ্ছেন, এটি অতি অল্প সময়ের মধ্যে এই সংসদকে অবহিত করবেন।”
