‘ভিক্ষুকের সন্তানও আবাসিক মাদরাসার ছাত্রদের চেয়ে ভালো থাকে’

দেশের বিভিন্ন আবাসিক মাদরাসায় শিশু শিক্ষার্থীদের বলাৎকার ও যৌন নিপীড়নের একের পর এক ঘটনা সামনে আসার পেরিপ্রেক্ষিতে এ ব্যাপারে দেশের আলেমদের ঐক্যবদ্ধ বিবৃতি ও সোচ্চার ভূমিকা রাখার আহ্বান জানিয়েছেন সুপরিচিত আলেম ও ইসলামি আলোচক আব্দুল হাই মুহাম্মদ সাইফুল্লাহ।

তিনি বলেন, গোপনীয়তার দোহাই দিয়ে ঘটনা ধামাচাপ দেওয়া কিংবা অভ্যন্তরীণ কিছু শাস্তি দিয়ে ভুক্তভোগীকে চুপ করিয়ে রাখার মধ্যে কোনো সমাধান নেই। বরং এতে সমস্যা আরও ভয়াবহ আকার ধারণ করছে এবং পুরো কওমি শিক্ষাব্যবস্থার প্রতি সাধারণ মানুষের বিশ্বাস সংকটের মুখে পড়ছে।

শুক্রবার (৪ সেপ্টেম্বর) নিজের ভেরিফায়েড ফেসবুক পেজে প্রকাশিত এক ভিডিও বক্তব্যে আব্দুল হাই মুহাম্মদ সাইফুল্লাহ বলেন:

“আমাদের সচেতন আলেম সমাজ, যারা আমাদের বর্তমান বাংলাদেশের দায়িত্বশীল পর্যায়ের আলেম, আপনারা যদি মনে করেন যে গোপনীয় বিষয় গোপন রেখেই এর সমাধান করে দেবেন, তবে আপনারা ভুলের মধ্যে আছেন। বরং আমরা বলব, জাতীয় পর্যায়ে ওলামায়ে কেরাম আপনারা একসঙ্গে বসুন এবং সঠিক কর্মপদ্ধতি নির্ধারণ করুন। কিছু মানুষের অপকর্ম সামগ্রিকভাবে পুরো ইসলামী শিক্ষাব্যবস্থার ওপর ইতোমধ্যে বড় ধরনের নেতিবাচক প্রভাব ফেলেছে।

প্রতিটি মাদরাসায় একটি করে স্বাধীন অভিযোগ কেন্দ্র থাকতে হবে। আপনি শুধু বলে দিলেন যে হুজুরের কথার ওপর আর কোনো কথা নেই, বড়দের কথা শুনে চলতে হবে-এটি আদবের কথা ঠিকই, কিন্তু কোনো অন্যায় হলে তা জানানোর মতো তো একটি জায়গা থাকতে হবে।

ঘটনা চেপে রাখার বা মুখ বন্ধ করিয়ে দেওয়ার মধ্যে আপনারা কোনো সমাধান পাবেন না। একটি বড় ধরনের বিস্ফোরণ ইতোমধ্যেই হয়ে গেছে। চেপে রেখে আপনি কার মুখ বন্ধ করাবেন? বরং স্বাধীন তদন্ত করতে হবে এবং ভুক্তভোগীদের এই আর্তনাদ শুনে অপরাধীদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নিতে হবে।

বিশেষ করে আবাসিক ব্যবস্থাপনার ব্যাপারে অত্যন্ত কঠোর পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হবে। শুনলে আপনাদের কাছে হয়তো খারাপ লাগবে, কিন্তু এটিই বাস্তবতা। আমাদের বাড়িতে অনেক ভিক্ষুক ভিক্ষা করার জন্য আসে, কোনো ভিক্ষুক কি তার বাড়িতে গিয়ে মাটিতে ঘুমায়? খেয়াল করে দেখবেন, কোনো ভিক্ষুকের বাড়িতে দামি খাট না থাকলেও অন্তত একটা কাঠের চৌকি আছে। সে সেই চৌকিতেই সন্তানকে শোয়ায়, তার সন্তানকেও সে মাটিতে ঘুম পাড়ায় না। বাংলাদেশের সবচেয়ে হতদরিদ্র মানুষও এখন মাটিতে থাকে না, ২০০ টাকা দামের হলেও একটি চৌকি ব্যবহার করে।

অথচ আমাদের বহু মাদরাসায় বড় বড় বিল্ডিং আছে, অনেক প্রতাপ আছে, কিন্তু বাচ্চাদের রাখা হয় মাটিতে। এক বাচ্চা আরেক বাচ্চার সাথে একেবারে গাদাগাদি করে লেগে থাকে। আর শয়তান তো এই সুযোগগুলো থেকেই কুমন্ত্রণা তৈরি করে!

কোনো আবাসিক প্রতিষ্ঠানে বাচ্চারা মাটিতে থাকতে পারবে না। তাদের জন্য দোতলা বা তিনতলা খাটের ব্যবস্থা করুন, প্রয়োজনে সাধারণ চৌকির ব্যবস্থা করুন। যদি সেই আর্থিক সামর্থ্য না থাকে, তবে মাদরাসায় অতিরিক্ত ছাত্র ভর্তি করবেন না। কিন্তু এই নাজুক ব্যবস্থা থেকে আপনাদের বের হয়ে আসতেই হবে।

একই সাথে দাবি জানাই, জাতীয় পর্যায়ের ওলামায়ে কেরাম আপনারা একটি গোলটেবিল বৈঠক আহ্বান করুন। শায়খ আহমদুল্লাহ একটি খোলা চিঠি লিখেছেন, সেখানে তিনি বেশকিছু প্রয়োজনীয় উদ্যোগের কথা তুলে ধরেছেন। যারা ইসলাম পছন্দ করে না, তারা এই ঘটনাগুলোকে ইসলামের বিরুদ্ধে হাতিয়ার বানাচ্ছে, ইসলামপন্থিদের এ নিয়ে চিন্তার শেষ নেই। তারা সামনে নিজেদের অবস্থান কীভাবে পরিষ্কার করবেন।

আপনারা হয়তো বলবেন, আমরা এগুলোর বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিচ্ছি, সব কথা তো আর বাইরে প্রকাশ করা যায় না। কিন্তু আমি বলি, যে অপরাধের ঘটনা প্রকাশ্যে চলে এসেছে, তার বিরুদ্ধে আপনারা কী ব্যবস্থা নিয়েছেন, সেটাও প্রকাশ্যে পুরো জাতিকে জানাতে হবে। আমাদের এই নেতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গি ও ঢাকঢাক-গুড়গুড় সংস্কৃতি থেকে বের হয়ে আসতে হবে।

কিছু মানুষের ব্যক্তিগত পাপাচারের দায় পুরো কওমি সমাজ বা আলেম সমাজের কাঁধে এসে পড়বে এটি আমাদের ভীষণ দুশ্চিন্তায় ফেলে দিয়েছে। জুব্বা আর টুপি পরলেই তো আর মানুষ প্রকৃত অর্থে হুজুর হয়ে যায় না! এই হুজুর পরিচয়ের আড়ালে এমন অনেকেই আছে, যাদের অপরাধ একজন সাধারণ মানুষের অপরাধের চেয়ে বহুগুণে বড়।

আপনারা অনেকে আমাদের কাছে ইতোমধ্যে জানতে চেয়েছেন, ‘হুজুর, আপনারা এসব বিষয়ে সোচ্চার হয়ে কথা বলেন না কেন?’ আমরা দু-একটি কথা বলি ঠিকই, যার জবাবে আমাদের লোকজনই বলে বসে, প্রচলিত আইনেই যা বিচার হওয়ার হোক।

আমরাও বিচার চাই। তবে আবেগের বশে ও বিবেকের তাড়নায় আমরা এ কথাও বলছি যে, যারা এ ধরনের জঘন্য অপরাধে অপরাধী, তারা তো নিজেদের ইসলামের অনুসারী দাবি করে। তুমি তো মাদরাসা বানিয়েছ এবং আল্লাহর রাসুলের আইনের পক্ষাবলম্বনকারী হিসেবে নিজেকে পরিচয় দাও; তবে বিশেষ ট্রাইব্যুনাল গঠন করে এবং বিশেষ অধ্যাদেশ জারি করে এ ধরনের কুলাঙ্গারদের শাস্তি কেন ইসলামী আইনেই বাস্তবায়ন করা হবে না? আমরা চাই, এই জালেমদের জন্য দৃষ্টান্তমূলক বিচারের ব্যবস্থা করা হোক।

আপনারা কত বিষয় নিয়ে কত কথা বলেন! কিন্তু আজ সারা দেশের মানুষ আলেম-ওলামাদের ভিন্ন চোখে দেখা শুরু করেছে। নিজেদের রাজনৈতিক হিংসা ও ব্যক্তিস্বার্থ চরিতার্থ করতে আপনারা একে অপরের বিরুদ্ধে কত মন্তব্যের বিষবাষ্প ছড়ান, অথচ এত বড় একটি জাতীয় ও মৌলিক সংকট নিয়ে কোনো জাতীয় ফোরাম, পরামর্শ সভা বা ঐক্যবদ্ধ আহ্বান আমরা দেখতে পাচ্ছি না!

আবদুল হাই সাইফুল্লাহ / ‘ইসলামের লেবাসে মিথ্যা বলে বহু মানুষের সম্মানহানি করেছেন আমানুল্লাহ’
আমাদের মুরুব্বিরা নিশ্চয়ই বিষয়টি ভেবে দেখবেন। আপনারা যত দ্রুত পদক্ষেপ নেবেন, আমাদের জন্য রক্ষা পাওয়ার পথ তত দ্রুত সুগম হবে। নচেৎ এমন একদিন আসবে, যখন এই শিক্ষাব্যবস্থা ও পুরো কার্যক্রমের প্রতি মানুষের মন থেকে ঘৃণা আর দূর করা যাবে না। আল্লাহ যেন আমাদের বিষয়টি বোঝার তওফিক দান করেন।

এই কুলাঙ্গারদের যেন দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির মুখোমুখি করা যায় এবং প্রচলিত আইনের মাধ্যমে দ্রুততম সময়ের মধ্যে সুষ্ঠু তদন্ত সাপেক্ষে তাদের বিচার সম্পন্ন হয় আমরা সেই আহ্বান জানাচ্ছি। আল্লাহ আমাদের সকলকে এসব অন্যায় থেকে হেফাজতে রাখুন এবং ইসলামী শিক্ষার মারকাজগুলোকে রক্ষা করুন।”