ব্যান্ডউইথ সংকটের দ্বারপ্রান্তে বাংলাদেশ, ইন্টারনেট খাতে বিপর্যয়ের আশঙ্কা

আন্তর্জাতিক ব্যান্ডউইথের চাহিদা দ্রুত বাড়তে থাকার বিপরীতে নতুন সাবমেরিন ক্যাবল সংযোগে সিদ্ধান্তহীনতার কারণে বড় ধরনের অবকাঠামোগত সংকটের মুখে পড়তে পারে বাংলাদেশ।

খাতসংশ্লিষ্টদের আশঙ্কা, সময়মতো নতুন সক্ষমতা যুক্ত করা না গেলে আগামী দশকে দেশের ডিজিটাল অর্থনীতি ব্যান্ডউইথ ঘাটতির কারণে বড় বাধার মুখে পড়বে।

সোমবার (৩১ আগস্ট) ঢাকার অদূরে একটি রিসোর্টে আয়োজিত ‘ডিজিটাল সার্বভৌমত্ব রক্ষা ও ভবিষ্যৎ ব্যান্ডউইথ চাহিদা পূরণে নতুন সাবমেরিন ক্যাবলের প্রয়োজনীয়তা’ শীর্ষক কর্মশালায় এসব তথ্য জানানো হয়।

কর্মশালা আয়োজন করে টেলিকম ও টেকনোলজি রিপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (টিআরএনবি)।

কর্মশালায় সংগঠনের সভাপতি মাসুদুজ্জামান রবিনের সভাপতিত্বে বক্তব্য রাখেন সংগঠনের সাধারণ সম্পাদক ফারুক হোসাইন।
কর্মশালায় সিডিনেট কমিউনিকেশনস লিমিটেডের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা মশিউর রহমান ও মেটাকোর সাবকম লিমিটেডের প্রজেক্ট লিড মাহমুদ শাহেদ দুটি উপস্থাপনায় সাবমেরিন ক্যাবলের ইতিহাস, বাংলাদেশে আরও সাবমেরিন ক্যাবলের প্রয়োজনীয়তা, বিনিয়োগ, ডিজিটাল সার্বভৌমত্ব রক্ষা ইত্যাদি বিষয়াদি তুলে ধরেন।

অনুষ্ঠানে মেটাকোর সাবকম লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক আহমেদ জুনায়েদ ও প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা মোহাম্মদ আমিনুল হাকিম উপস্থিত ছিলেন।
মেটাকোর সাবকম লিমিটেডের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা মোহাম্মদ আমিনুল হাকিম বলেন, দেশে প্রাইভেট সাবমেরিন ক্যাবলে সংযুক্ত হলে দেশের ডিজিটাল সার্বভৌমত্ব সুরক্ষিত হবে।

ইন্টারনেটের দাম ৫০ শতাংশ কমে যাবে। কোয়ালিটি অব সার্ভিস ২৫-৩০ শতাংশ বৃদ্ধি পাবে, ল্যাটেন্সি কমবে। তিনি আরও বলেন, নতুন সাবমেরিন ক্যাবল এলে দেশে ইন্টারনেট ব্যবহারের হার ২০-৩০ শতাংশ বৃদ্ধি পাবে। তিনি আরও বলেন, আমাদের মূল প্রতিদ্বন্দ্বী সাবমেরিন ক্যাবল কোম্পানি নয়, আইটিসি (ইন্টারন্যাশনাল টেরেস্ট্রিয়াল ক্যাবল)।
কর্মশালায় জানানো হয়, গত এক দশকে দেশে আন্তর্জাতিক ব্যান্ডউইথের ব্যবহার বেড়েছে নজিরবিহীন হারে। ২০১৩ সালে যেখানে ব্যবহার ছিল মাত্র ৫০ জিবিপিএস, ২০১৮ সালে তা বেড়ে শূন্য ৭৬ টেরাবিট, ২০২০ সালে ১ দশমিক ৭৮ টেরাবিট, ২০২২ সালে ৪ দশমিক ২ টেরাবিট, ২০২৪ সালে ৬ দশমিক ৮৬ টেরাবিট এবং ২০২৬ সালে প্রায় ১৩ দশমিক ৫ টেরাবিটে পৌঁছেছে। অর্থাৎ ১৩ বছরে ব্যবহার বেড়েছে প্রায় ২৬০ গুণ। আর বর্তমানে দেশে আন্তর্জাতিক ব্যান্ডউইথের চাহিদা প্রায় ১৩ দশমিক ৫ টেরাবিট।

পূর্বাভাস অনুযায়ী, ২০২৭ সালে তা ১৯ দশমিক ১ টেরাবিট, ২০২৮ সালে প্রায় ২৭ টেরাবিট, ২০৩০ সালে ৫৪ টেরাবিট এবং ২০৩৫ সালে ৩০৫ টেরাবিট এবং ২০৩৬ সালে ৪৩২ টেরাবিটে পৌঁছাতে পারে। ভিডিও স্ট্রিমিং, ক্লাউড, ডেটা সেন্টার, এআই, অনলাইন শিক্ষা, ডিজিটাল পেমেন্ট ও শিল্পখাতে ডিজিটালাইজেশনের কারণে এ চাহিদা আরও বাড়তে পারে।

অন্যদিকে বাংলাদেশের আন্তর্জাতিক সংযোগের মূল ভরসা বর্তমানে দুটি সরকারি সাবমেরিন ক্যাবল—সি-মি-উই-৪ ও সি-মি-উই-৫। এগুলোর সক্ষমতা যথাক্রমে ৪ দশমিক ৬ ও ২ দশমিক ৫ টেরাবিট। অবশিষ্ট ব্যান্ডউইথ আইটিসির মাধ্যমে আমদানি করা হয়।

এসময় আরও জানানো হয়, দুটি ক্যাবলের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতায় ঝুঁকি আরও বাড়ছে। ভারত যেখানে ১৯টি, মালয়েশিয়া ২৩টি, থাইল্যান্ড ১২টি এবং ফিলিপাইন ১৯টি আন্তর্জাতিক সাবমেরিন ক্যাবলের সঙ্গে যুক্ত, সেখানে বাংলাদেশের রয়েছে মাত্র দুটি। কোনো একটি ক্যাবলে ত্রুটি বা রক্ষণাবেক্ষণজনিত সমস্যা হলে জাতীয় পর্যায়ে ইন্টারনেট সেবায় বড় চাপ তৈরি হতে পারে।

সরকারের তৃতীয় সাবমেরিন ক্যাবল সি-মি-উই-৬ চালু হলেও দীর্ঘমেয়াদে তা যথেষ্ট হবে না বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। কারণ সি-মি-উই-৪-এর কার্যকাল ২০৩০ সালে শেষ হওয়ার কথা। পূর্বাভাস অনুযায়ী, ২০২৮ সালে ব্যান্ডউইথ ঘাটতি থাকবে প্রায় ২০ টেরাবিটে পৌঁছাতে পারে।

এ অবস্থায় বেসরকারি খাতে নতুন সাবমেরিন ক্যাবল স্থাপনের অনুমোদনকে গুরুত্বপূর্ণ সমাধান হিসেবে দেখছেন খাতসংশ্লিষ্টরা। প্রস্তাবিত ক্যাবলগুলো চালু হলে প্রায় ৫১ টেরাবিট অতিরিক্ত সক্ষমতা যুক্ত হয়ে মোট সক্ষমতা প্রায় ৬৭ টেরাবিটে পৌঁছাতে পারে। এতে বাজারে প্রতিযোগিতা বাড়বে, ভারত থেকে ব্যান্ডউইথ আমদানির ওপর নির্ভরতা কমবে এবং পাইকারি ব্যান্ডউইথের দাম উল্লেখযোগ্যভাবে কমার সুযোগ তৈরি হবে। সংশ্লিষ্টদের দাবি, ইন্টারনেটের দাম ৫০ শতাংশ পর্যন্ত কমতে পারে।

অনুষ্ঠানে জানানো হয়, প্রশ্নটি শুধু আজকের ব্যান্ডউইথ সংকটের নয়, ২০৩০ ও ২০৩৫ সালের বাংলাদেশের ডিজিটাল সক্ষমতার। সাবমেরিন ক্যাবল পরিকল্পনা, অর্থায়ন, নির্মাণ ও চালু করতে কয়েক বছর সময় লাগে। ফলে সংকট দৃশ্যমান হওয়ার পর উদ্যোগ নিলে সমাধানের জন্য প্রয়োজনীয় সময় নাও থাকতে পারে। তাদের আশঙ্কা, সিদ্ধান্তহীনতা অব্যাহত থাকলে সি-মি-উই-৩-এর সুযোগ হারানোর মতো আরেকটি কৌশলগত ভুলের পুনরাবৃত্তি হতে পারে।