রংপুর নগরীর মাছুয়াপাড়ায় শিক্ষক গণপতি চক্রবর্তীসহ একই পরিবারের চারজন হত্যার ঘটনায় গ্রেপ্তার সিদ্ধার্থ দাস ও মুগ্ধ দাসের ডোপ টেস্টে শরীরে মাদকের কোনো অস্তিত্ব পাওয়া যায়নি বলে জানিয়েছে পুলিশ।
সোমবার (৩১ আগস্ট) দুপুরে সাংবাদিকদের এই তথ্য জানান রংপুর মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের (ডিবি) উপকমিশনার সনাতন চক্রবর্তী। পাশাপাশি পুলিশ জানিয়েছে, সিদ্ধার্থ ও মুগ্ধকে তিন দিনের রিমান্ড চাওয়া হয়েছে।
তিনি বলেন, নিরাপত্তাজনিত কারণে রোববার জেলগেট থেকে দুইজনের নমুনা সংগ্রহ করা হয়। পরে ওই নমুনা পরীক্ষা করে এমফিটামিনের অস্তিত্ব পাওয়া যায়নি। ডোপ টেস্টে তাদের শরীরে মাদকের উপস্থিতি পাওয়া যায়নি।
এর আগে রোববার (৩০ আগস্ট) দুপুর সোয়া একটার দিকে ডিবি পুলিশের একটি দল রংপুর কেন্দ্রীয় কারাগারে গিয়ে দুই আসামির নমুনা সংগ্রহ করে। এ সময় তাদের সঙ্গে রংপুর মেডিক্যাল কলেজের ল্যাবের একজন টেকনোলজিস্ট ও একজন সহকারী ছিলেন।
আসামিদের নিরাপত্তার স্বার্থে কারাগারেই নমুনা সংগ্রহের ব্যবস্থা করতে রংপুর মেডিক্যাল কলেজের অধ্যক্ষের কাছে অনুরোধ জানায় ডিবি। অনুমতি পাওয়ার পর মেডিক্যাল কলেজের টেকনোলজিস্টকে সঙ্গে নিয়ে কারাগারে যায় পুলিশের দল।
গত ২২ আগস্ট রংপুর নগরীর মাছুয়াপাড়া এলাকায় নিজ বাড়ি থেকে রংপুর জিলা স্কুলের অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক গণপতি চক্রবর্তী, তার স্ত্রী ও দুই সন্তানের মরদেহ উদ্ধার করে পুলিশ। এ ঘটনায় প্রতিবেশী সিদ্ধার্থ দাস ও মুগ্ধ দাসকে গ্রেপ্তার করা হয়। পরে তারা আদালতে ফৌজদারি কার্যবিধির ১৬৪ ধারায় স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দেন।
এ ঘটনায় গণপতি চক্রবর্তীর বড়ো ভাই গোপীনাথ চক্রবর্তী বাদি হয়ে রংপুর নগরীর কোতোয়ালি থানায় অজ্ঞাতনামা আসামিদের বিরুদ্ধে হত্যা মামলা করেন।
২৩ অগাস্ট সকালে রংপুর মহানগর পুলিশের গোয়েন্দা বিভাগের উপকমিশনার সনাতন চক্রবর্তী সাংবাদিকদের বলেন, সম্ভবত ডাকাতির ঘটনায় চারজনের মৃত্যু হয়েছে। কিন্তু কিন্তু মাত্র সাত ঘণ্টার ব্যবধানে সেই বয়ান বদলে যায়। পুলিশ দাবি করে, মাদকসেবনে বাধা দেওয়ায় গণপতি ও তার পরিবারের সদস্যদের হত্যা করা হয়েছে এবং দুইজনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে।
পরে রংপুর মহানগর পুলিশের কমিশনার মোহাম্মদ আব্দুল মাবুদ প্রেস ব্রিফিংয়ে বলেন, বাড়ির ছাদে ইয়াবা সেবনে বাধা দেওয়ায় গণপতি চক্রবর্তী, তার স্ত্রী ও দুই সন্তানকে হত্যা করা হয়েছে। এ ঘটনায় দুইজনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। গ্রেপ্তাররা হলেন- নগরীর মাছুয়াপাড়া এলাকার কানুদাসের ছেলে মুগ্ধ দাস (২৩) ও বিনয়চন্দ্র দাসের ছেলে সিদ্ধার্থ দাস (১৯)।
এরপর সেই ভাষ্যও বদলে যায়। হত্যার স্থান, সময় ও ঘটনার কারণ নিয়ে আসে নতুন তথ্য।
২৭ অগাস্ট রংপুরে চার খুনের মামলার সবশেষ অগ্রগতি ও বিভিন্ন দিক নিয়ে সাংবাদিক সম্মেলন করেন তখনকার মহানগর পুলিশের কমিশনার মোহাম্মদ আব্দুল মাবুদ।
হত্যার কারণ নিয়ে ভিন্ন তথ্য দিয়ে তিনি বলেন, ইয়াবা সেবনে বাধার পাশাপাশি গণপতি চক্রবর্তীর পরিবারের সঙ্গে জমিজমা নিয়ে সিদ্ধার্থর অসন্তোষও থাকতে পারে।
সিদ্ধার্থ দাসের আদালতে দেওয়া জবানবন্দির বরাত দিয়ে আব্দুল মাবুদ বলেন, গণপতি চক্রবর্তীরা সিদ্ধার্থর পূর্বপুরুষের জমি কিনেছিলেন।
তিনি আরও বলেন, জমি তুলনামূলক বেশি দামে কেনা হলেও সিদ্ধার্থের পরিবারের শরিকেরা তাদের প্রাপ্য টাকা পাননি—এমন একটি বিষয় তদন্ত করে দেখা হচ্ছে। এ নিয়ে সিদ্ধার্থের মনে ক্ষোভ থাকতে পারে।
এদিকে একটি অনুসন্ধানকারী দলে মনে করছে, হত্যার উদ্দেশ্য, সময়, হত্যার পদ্ধতি, রাত দুইটা ৪০ মিনিটের অস্বাভাবিক ফোনকল, হত্যাকাণ্ডের পর অভিযুক্ত ব্যক্তিদের বাড়িতে অবস্থান, খাবার খাওয়া ও গোসল করা নিয়ে পুলিশের দাবির সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ কোনো ফরেনসিক ও ডিজিটাল আলামত পাওয়া গেছে কিনা, তা স্পষ্ট হওয়া জরুরি। তবে এরই বাড়িতে বিদ্যুতের সুইচ দিতে গিয়ে চক্রবর্তী বাড়ির পানির মোটরের লাইনে পুলিশের ‘ভুল করে চাপ’ পড়ে। এতে ট্যাঙ্কি উপচে বাড়ির ছাদ গড়িয়ে পানি নিচে নেমে আসে।
অপরদিকে একাত্তরের অনুসন্ধানে বের হয়ে আসে একটি নতুন তথ্য। গণপতি পরিবারের চারজনের ময়নাতদন্তের বিষয়ে রংপুর মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের মর্গের এক ডোম একাত্তরকে জানান, দুই মৃত নারীর শরীরে শুক্রাণুর উপস্থিতি পাওয়া গেছে এবং তা সংরক্ষণ করা হয়েছে। এ বিষয়ে কাউকে কিছু বলতে নিষেধ করা হয়েছে বলেও দাবি করেন তিনি।
তবে ২৬ অগাস্ট রংপুর মেডিক্যাল কলেজের ফরেনসিক মেডিসিন বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক বাবলু কিশোর বিশ্বাস বলেন, গণপতি চক্রবর্তী, তার স্ত্রী ও দুই সন্তানকে শ্বাসরোধে হত্যা করা হয়েছে। মরদেহ পরীক্ষায় যৌন নির্যাতনের কোনো চিহ্ন পাওয়া যায়নি। ল্যাবরেটরিতে পাঠানো নমুনাতেও ধর্ষণের পক্ষে কোনো প্রমাণ মেলেনি।
ডোমের বক্তব্যের বিষয়ে বাবলু কিশোর বলেন, ভ্যাজাইনাল সোয়াব নেওয়ার সময় তার মনে হয়ে থাকতে পারে যে, পরীক্ষায় রেজাল্ট আসতে পারে। হয়তো সে কারণেই সে এমন কথা বলেছে। তবে পরীক্ষায় ধর্ষণের কোনো আলামত পাওয়া যায়নি।
সবশেষে যে দুইজনকে ‘ইয়াবা সেবনে বাঁধা’, ও ‘পরিচয় প্রকাশ’ করার ভয় দেখানোর পর শিশু, নারী, পুরুষসহ চারজনের হত্যার ঘটনা বলে পুলিশ দাবি করলো, সপ্তাহ গড়াতে মেডিক্যাল পরীক্ষার পর সেই পুলিশই বললো, আটকদের শরীরের মাদকের কোনো উপস্থিতি পাওয়া যায়নি।
