আপনার পেশাজীবন কবে শুরু হয়?
—আমার পেশাজীবনের সূচনা প্রায় ৩০ বছর আগে। তৎকালীন শিক্ষাব্যবস্থা আর বর্তমানের শিক্ষাব্যবস্থার মধ্যে অনেক পরিবর্তন এসেছে।
একাডেমিক পড়াশোনায় হিউম্যান রিসোর্স (এইচআর) একটি বিষয় হিসেবে অন্তর্ভুক্ত থাকলেও তখন আলাদাভাবে কোনো মেজর ছিল না। আমাদের সময়ে ব্যাচেলর অব কমার্স (বিকম) শেষ করেই চাকরির বাজারে প্রবেশ করা যেত। আমি সৌভাগ্যবান যে আমার ক্যারিয়ার শুরু হয়েছিল বিশ্বখ্যাত প্রতিষ্ঠান নেসলে থেকে। পরবর্তীকালে আমি ব্র্যাকে চার বছর কাজ করেছি।
করপোরেট ও বিজনেস সেক্টরে দীর্ঘ ১৩-১৪ বছরের অভিজ্ঞতা নিয়ে আমি ব্র্যাকে চিফ পিপল অফিসার হিসেবে যোগ দিই। ডেভেলপমেন্ট সেক্টরে কাজ করার অভিজ্ঞতা পুরোপুরি আলাদা ছিল।
বতর্মানে চাকরির বাজার সম্পর্কে আপনার মূল্যায়ন কী? চাকরির ক্ষেত্র বা সুযোগ কি আগের চেয়ে বেড়েছে, নাকি সংকুচিত হচ্ছে?
—চাকরির বাজার সংকুচিত হচ্ছে—এই ধারণার সঙ্গে আমি পুরোপুরি একমত নই। মূলত এখনকার আধুনিক প্রযুক্তির বিশ্বে অনেক ক্ষেত্রেই প্রেক্ষাপট দ্রুত পরিবর্তিত হচ্ছে।
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) ও প্রযুক্তির উৎকর্ষের কারণে হয়তো কিছু গতানুগতিক পদের প্রয়োজন কমছে। কিন্তু বিপরীতে শত শত নতুন ধরনের চাকরির সুযোগ তৈরি হয়েছে। আমাদের তরুণ প্রজন্মের অনেকেই এখন প্রথাগত ৯টা-৫টা অফিসের বাইরে এসে কাজ করছে। যেমন—গ্রামীণফোন একাডেমির মাধ্যমে ডিজিটাল মার্কেটিং কিংবা টেকনিক্যাল স্কিলে প্রশিক্ষণ নিয়ে তরুণরা ঘরে বসেই ফ্রিল্যান্সিং করে প্রচুর বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন করছে। তাই আমি বলব, কাজের সুযোগ ও ক্ষেত্র আগের চেয়ে বহুগুণ বিস্তৃত ও বৈচিত্র্যময় হয়েছে।
কাজের পদের সংখ্যা কমছে না, বরং ধরন বদলাচ্ছে।
আবেদনের পর সঠিক প্রার্থী বাছাইয়ের ক্ষেত্রে মানবসম্পদ বিভাগ কোন কোন বিষয়ের ওপর গুরুত্ব দেয়?
—সঠিক প্রার্থী নির্বাচন প্রক্রিয়ায় এখন আর আমরা শুধু প্রার্থীর একাডেমিক সিজিপিএ বা ডিগ্রির ওপর এককভাবে নির্ভর করি না। আমরা সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দিই প্রার্থীর গ্রোথ মাইন্ডসেট বা শেখার মানসিকতার ওপর। কারণ একটি পদের বিপরীতে যখন অসংখ্য আবেদন জমা হয়, তখন প্রাথমিকভাবে সিজিপিএ দেখে কিছু বাছাই করতে হয়। কিন্তু চূড়ান্ত নির্বাচনে প্রার্থীর শেখার আগ্রহ প্রধান বিবেচ্য হয়ে দাঁড়ায়। গ্রোথ মাইন্ডসেট বলতে আমরা প্রার্থীর শেখার আগ্রহ, নতুন পরিস্থিতিতে নিজেকে মানিয়ে নেওয়ার সক্ষমতা এবং বিভিন্ন কার্যক্রমে বাস্তব অবদানকে বুঝি। আমরা দেখি, পড়াশোনার পাশাপাশি প্রার্থী কোনো সামাজিক কাজ, স্বেচ্ছাসেবামূলক বা অন্যান্য প্রজেক্টে নেতৃত্ব দিয়েছে কি না। এসব কাজ আমাদের কাছে ফলাফলের চেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ।
প্রার্থীদের কোন ভুলগুলো বেশি চোখে পড়ে?
—সিভিতে বানান ভুল সচরাচর দেখা যায়। এ ছাড়া অনেকেই অপ্রয়োজনীয় তথ্য দিয়ে সিভি দীর্ঘ করে ফেলে। সিভি হওয়া উচিত সংক্ষিপ্ত, স্পষ্ট ও পরিচ্ছন্ন। দীর্ঘ ও অপ্রাসঙ্গিক সিভি নিয়োগকর্তার কাছে বিরক্তির কারণ হতে পারে।
বেসরকারি সেক্টরে মানবসম্পদ (এইচআর) বিভাগগুলো কি সত্যিই যোগ্য কর্মী বাছাইয়ের যথাযথ প্রক্রিয়া অনুসরণ করতে পারছে?
—আমি বিশ্বাস করি, এইচআর একটি প্রতিষ্ঠানের শুধু সাহায্যকারী বিভাগ নয়; বরং এটি প্রতিষ্ঠানের অন্যান্য বিভাগের মতো ব্যবসা এগিয়ে নিয়ে যেতে কাজ করে। এখন এইচআর বিভাগগুলো কতটুকু সফলভাবে কর্মী বাছাই করতে পারছে, তা নির্ভর করে তারা নিজেদের ব্যবসার মূল লক্ষ্য কতটা গভীরভাবে অনুধাবন করতে পারছে, তার ওপর। প্রতিষ্ঠানের ঠিক কী ধরনের দক্ষতা বা স্কিলসেট প্রয়োজন, সেটি অনুধাবন করতে না পারলে দিনশেষে প্রতিষ্ঠানকে তার মূল্য দিতে হয়। এ ক্ষেত্রে করণীয় হলো, প্রতিষ্ঠানের ভবিষ্যতের লক্ষ্য অনুযায়ী প্রতিটি সুনির্দিষ্ট পদের জন্য প্রয়োজনীয় সক্ষমতা সঠিকভাবে চিহ্নিত করা এবং একটি সুশৃঙ্খল ও সিস্টেমেটিক নিয়োগ পদ্ধতি অনুসরণ করা।
মানবসম্পদ সেক্টরে কেউ যদি চাকরি করতে চায়, তার একাডেমিক ও প্রফেশনাল কোন কোন ডিগ্রি থাকতে হবে? এই সেক্টরে চ্যালেঞ্জ কী?
—এইচআরে ক্যারিয়ার গড়তে হলে বিবিএ কিংবা এমবিএ (মেজর—এইচআরএম) বা হিউম্যান রিসোর্স ম্যানেজমেন্টে পোস্ট-গ্র্যাজুয়েট ডিপ্লোমা থাকলে ভালো হয়। প্রফেশনাল ডিগ্রির মধ্যে গ্লোবাল সার্টিফিকেশনগুলো প্রার্থীকে প্রতিযোগিতায় এগিয়ে রাখবে। এইচআর এখন আর শুধু অ্যাডমিনিস্ট্রেটিভ কাজ নয়, এটি ব্যবসার মূল স্ট্র্যাটেজিক পার্টনার। তাই এখানে নেতৃত্বের পর্যায়ে যাওয়ার সুযোগ ও ক্যারিয়ার গ্রোথ বেশ ভালো। প্রতিনিয়ত পরিবর্তনশীল কর্মপরিবেশের সঙ্গে কর্মীদের খাপ খাওয়ানো, ট্যালেন্ট ধরে রাখা এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার যুগে হিউম্যান টাচ বজায় রাখা এই সেক্টরের বড় চ্যালেঞ্জ।
প্রার্থীদের একাডেমিক যোগ্যতার পাশাপাশি আর কোন কোন বিষয়ে দক্ষ বা জানাশোনা থাকা উচিত? কোন বিষয়ে এগিয়ে থাকতে হবে?
—একাডেমিক ফলাফল কম ভালো থাকলেও করপোরেট দুনিয়ায় ক্যারিয়ার গড়া সম্ভব। এর জন্য একাডেমিক পড়াশোনার পাশাপাশি সহশিক্ষা কার্যক্রম, বিভিন্ন ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম থেকে নেওয়া আন্তর্জাতিক সার্টিফিকেশন এবং প্রযুক্তিগত দক্ষতা আপনাকে অনেক দূর এগিয়ে রাখবে। আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো যোগাযোগের দক্ষতা। এর মানে শুধু অনর্গল ইংরেজি বা বাংলায় কথা বলা নয়; আপনি যা বোঝাতে চাইছেন তা অন্য প্রান্তের মানুষের কাছে স্পষ্টভাবে পৌঁছাতে পারছেন কি না, এটাই মূলকথা। এ ছাড়া শেখার অদম্য ইচ্ছা, যেকোনো প্রতিকূল পরিস্থিতির সঙ্গে মানিয়ে নেওয়ার ক্ষমতা, ধৈর্য এবং টিমের সঙ্গে মিলে কাজ করার মনোভাব থাকলে যেকোনো একাডেমিক ফল বা সিজিপিএ নিয়েও সফল হওয়া সম্ভব।
এআই চাকরির বাজারে কতটা প্রভাব ফেলেছে? এই প্রযুক্তির ফলে চাকরির বাজারের ভবিষ্যৎ কী হবে?
—আমরা আমাদের কর্মপদ্ধতিতে এরই মধ্যে এআই অন্তর্ভুক্ত করেছি এবং এটি প্রতিনিয়ত আরো উন্নত হচ্ছে। শুরুতে অনেকেই ভেবেছিলেন, এআই হয়তো মানুষের চাকরি কেড়ে নেবে। কিন্তু বাস্তব অভিজ্ঞতা হলো, এআই আমাদের কাজের সহযোগী হিসেবে কাজ করে। এটি ডেটা অ্যানালিটিকস ও সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়াকে আরো দ্রুত ও নিখুঁত করতে সাহায্য করে। অবশ্যই কিছু গতানুগতিক চাকরি হয়তো বিলুপ্ত হবে, কিন্তু এর বিপরীতে বহু নতুন সুযোগ সৃষ্টি হবে। আমাদের শিক্ষার্থী ও চাকরিজীবী—সবারই উচিত প্রযুক্তির সঙ্গে তাল মিলিয়ে প্রতিনিয়ত নিজেকে সমৃদ্ধ করা। আমাদের চারপাশের এই পরিবর্তনকে সত্য হিসেবে মেনে নিয়ে প্রতিনিয়ত নতুন প্রযুক্তি শিখতে হবে। তরুণদেরও বলব, এআই সম্পর্কে শুধু প্রাথমিক ধারণা বা প্রম্পট লেখার মধ্যে সীমাবদ্ধ না থেকে এর অ্যাডভান্সড লেভেলের লার্নিং ও প্রয়োগ শিখতে হবে।
একজন তরুণ গ্র্যাজুয়েট টেলিযোগাযোগ খাত বা বড় করপোরেট প্রতিষ্ঠানে চাকরি পেতে চাইলে সে নিজেকে কিভাবে প্রস্তুত করবে?
—টেলিযোগাযোগ খাত বর্তমানে একটি বড় ধরনের পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। গতানুগতিক ভয়েস কলে কথা বলা বাদ দিয়ে আমরা এখন ওটিটি ও ডেটা কেন্দ্রিক ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে গুরুত্ব দিচ্ছি। ফলে এই খাতে ডিজিটাল ও এআই ভিত্তিক নতুন নতুন দক্ষতার চাহিদা বাড়ছে। যখন কোনো প্রার্থী আমাদের প্রতিষ্ঠানে ইন্টারভিউ দিতে আসে, আমরা শুধু তার মূল ডিগ্রি দেখি না; আমরা জানতে চেষ্টা করি, পুরো ইন্ডাস্ট্রির পরিবর্তন সম্পর্কে সে কতটা সচেতন, বর্তমান কাজের ধারা সম্পর্কে তার জানাশোনা কেমন এবং তার ভেতরে শেখার আগ্রহ কতখানি। প্রার্থীর মধ্যে শেখার অদম্য ইচ্ছা ও গ্রোথ মাইন্ডসেট থাকলে তার চাকরি পাওয়ার সম্ভাবনা বাড়ে।
