২৩০০ বছরের পুরোনো দর্শন বদলে দেবে জীবন

মুহাম্মাদ রাহাতুল ইসলাম

জীবন সম্পর্কে আমাদের সবারই আলাদা আলাদা দৃষ্টিভঙ্গি আছে। আমরা নিজের চিন্তা অনুযায়ী জীবনকে সংজ্ঞায়িত করে থাকি। সুখ, দুঃখ, সফলতা, ব্যর্থতা এ সবকিছুর জন্যই আমাদের আছে আলাদা আলাদা ডেফিনেশন। এ সবকিছু আপাতত বাদ দিয়ে চলুন আমরা জীবন সম্পর্কিত একটি নতুন দর্শন সম্পর্কে জেনে নিই।

শুরুতেই রোমান সম্রাট মার্কাস অরেলিয়াসের একটি কথা সম্পর্কে জেনে নিই। যা তিনি তাঁর ব্যক্তিগত ডায়েরিতে নিজের জন্য লিখেছিলেন। মার্কাস অরেলিয়াস লিখেছেন, ‌‘মানুষের নিজস্ব মূল্য নির্ধারিত হয় সে কিসের পেছনে তার শক্তি ব্যয় করে তার দ্বারা।’ এর অর্থ হলো, একজন মানুষ কোন জিনিসের প্রতি আকর্ষণ বোধ করেন বা কিসের পেছনে ছোটেন; সেটিই তার প্রকৃত পরিচয় ও মূল্য নির্ধারণ করে।

এবার চলুন আমরা কাঙ্ক্ষিত সেই দর্শন সম্পর্কে জেনে নিই। স্টোইসিজম একটি ব্যবহারিক জীবনদর্শন। যারা এটি অনুসরণ করেন, তাদের বলা হয় ‘স্টোইক’। আজ থেকে প্রায় ২৩২৫ বছর আগে জিনো নামক ব্যক্তি এথেন্সে এই দর্শনের সূচনা করেন। জিনোর গল্পটি বেশ ইন্টারেস্টিং। তিনি ছিলেন এক ধনী ব্যবসায়ী। জাহাজডুবিতে তার সমস্ত সম্পদ হারান। সবকিছু হারিয়ে তিনি এথেন্সে আসেন এবং যে কোনো ভাবে সক্রেটিসের দর্শন দ্বারা অনুপ্রাণিত হন।

পরে তিনি নিজেই একটি স্কুল তৈরি করেন, যেখান থেকে স্টোইসিজমের যাত্রা শুরু হয়। এ দর্শন কেবল বড় বড় তাত্ত্বিক কথা বলে না বরং জীবনের কঠিন সময়ে কীভাবে মানসিকভাবে শক্তিশালী থাকা যায়, সেই পথ দেখায়। স্টোইক তথা যারা স্টোইসিজম অনুসরণ করেন, তাদের প্রধান পরিচয় ও বৈশিষ্ট্য হচ্ছে স্টোইকরা সমাজের যে কোনো স্তরের মানুষ হতে পারেন। যেমন- বিখ্যাত রোমান সম্রাট মার্কাস অরেলিয়াস, দাসের জীবন থেকে দার্শনিক হয়ে ওঠা এপিকটিটাস এবং প্রভাবশালী রাজনীতিবিদ সেনেকা। সবাই ছিলেন স্টোইক। অর্থাৎ ধনী-দরিদ্র নির্বিশেষে যে কেউ এ দর্শনচর্চা করতে পারেন।

স্টোইকরা বিশ্বাস করেন যে, মহাবিশ্ব একটি নির্দিষ্ট যুক্তিযুক্ত নিয়ম বা ‘লোগোস’ মেনে চলে। যেহেতু মানুষ একটি যুক্তিবাদী প্রাণী, তাই যুক্তি এবং গুণের সাথে সামঞ্জস্য রেখে চলাই একজন স্টোইকের প্রধান লক্ষ্য। স্টোইকদের একটি বড় বৈশিষ্ট্য হলো, তারা জানেন কোন জিনিসগুলো তাদের নিয়ন্ত্রণে আছে আর কোনগুলো নেই। তারা কেবল নিজের চিন্তা, দৃষ্টিভঙ্গি এবং কাজের ওপর ফোকাস করেন। কারণ এগুলো মানুষের নিয়ন্ত্রণে আছে।

বাইরের ঘটনা বা অন্যের মতামত যা তাদের নিয়ন্ত্রণে নেই, তা তারা শান্তভাবে গ্রহণ করে নেন। একজন স্টোইক তার জীবনে চারটি মূল গুণের চর্চা করেন: প্রজ্ঞা, ন্যায়বিচার, সাহস এবং পরিমিতিবোধ বা আত্মনিয়ন্ত্রণ। কঠিন সময়ে বা দুশ্চিন্তার মুহূর্তে ইমোশনালি স্ট্রং থাকা এবং সঠিক সিদ্ধান্ত নিতে পারা একজন স্টোইকের অন্যতম গুণ। তারা বিশ্বাস করেন যে, পরিস্থিতি যা-ই হোক না কেন, সৎপথে থেকে এবং যুক্তিনির্ভর হয়ে একটি সুন্দর বা ভার্চুয়াস জীবন কাটানো সম্ভব।

স্টোইকরা নিজেদের কেবল একটি নির্দিষ্ট শহরের নাগরিক না ভেবে ‘কসমোপলিটান’ বা বিশ্বের নাগরিক হিসেবে মনে করেন। তারা বিশ্বাস করেন, পৃথিবীর যে কোনো স্থানে থেকেই প্রকৃতির নিয়ম মেনে ভার্চুয়াস লাইফ লিড করা সম্ভব। স্টোইসিজমের দৃষ্টিতে ‘আ গুড লাইফ ইজ আ ভার্চুয়াস লাইফ। আর সুন্দর জীবনের জন্য রাজা বা সম্রাট হওয়ার প্রয়োজন নেই। আপনি রিকশাচালক হোন কিংবা বড় কোনো কর্মকর্তা। যে কোনো পরিস্থিতিতে কেবল সঠিক কাজটি করাই হলো সার্থকতা। যখন আপনি যুক্তিবাদী হয়ে সৎপথে চলবেন, তখন পৃথিবীর যেখানেই থাকুন না কেন, আপনি শান্তিতে থাকবেন এবং নিজেকে বিশ্বের নাগরিক বা ‘কসমোপলিটান’ হিসেবে অনুভব করবেন।

সহজ কথায়, নিজের চরিত্রকে উন্নত করা এবং প্রতিকূলতার মাঝেও সঠিক কাজ করে যাওয়াই হলো একটি সার্থক ও সুন্দর জীবনের মূল মন্ত্র। স্টোইসিজমে ভার্চুয়াস লাইফের পাশাপাশি আরেকটা কথাও বলা হয়। সেটা হলো রেশনাল লাইফ। রেশনাল লাইফ হলো মানুষের অনন্য ক্ষমতা, যুক্তি ব্যবহার করে মহাবিশ্বের নিয়মের সাথে মিল রেখে চলা। স্টোইকদের মতে, যুক্তি দিয়ে চিন্তা করা, মানুষের একটি বিশেষ গুণ বা ‘ডিভাইন কোয়ালিটি’, যা অন্য প্রাণীর নেই।

আমাদের প্রধান দায়িত্ব হলো, এই যুক্তিকে কাজে লাগিয়ে পরিস্থিতি অনুযায়ী সঠিক ও সৎ কাজ করা। সহজ কথায়, যুক্তি মেনে সৎভাবে বেঁচে থাকাই হলো রেশনাল লাইফ, যা মানুষকে যে কোনো পরিস্থিতিতে প্রকৃত শান্তি দেয় এবং পশুর বদলে একজন প্রকৃত মানুষ হিসেবে গড়ে তোলে।