Breaking News
Home / Study Care / বাকপ্রতিবন্ধী গরিব দুই বোনের স্কুলে যাওয়ার গল্পবাকপ্রতিবন্ধী গরিব দুই বোনের স্কুলে যাওয়ার গল্প

বাকপ্রতিবন্ধী গরিব দুই বোনের স্কুলে যাওয়ার গল্পবাকপ্রতিবন্ধী গরিব দুই বোনের স্কুলে যাওয়ার গল্প

ওরা দুই বোন। দুজনই বাকপ্রতিবন্ধী। ফলে শব্দ করে অন্যদের কাছে মনের ভাব প্রকাশ করতে পারে না তারা। কিন্তু তাতে কী! কথা বলতে না পারলেও ইশারায় অনায়াসে সব কিছুই বুঝিয়ে দিতে পারে এ দুই কিশোরী। শুধু তাই নয়, কোনো কোনো ক্ষেত্রে তাদের বোঝানোর ক্ষমতা বা অন্যান্য দক্ষতা সাধারণ অন্য মেয়েদের চেয়েও বেশি। ফলে বাকপ্রতিবন্ধী হয়েও মূক স্কুলে পড়াশোনা না করে তারা পড়ছে সাধারণ স্কুলে। অনেক সুস্থ-স্বাভাবিক ছাত্রীর চেয়ে ভালো ফলাফল করে নজরও কাড়ছে সবার। যা আশাবাদী করে তুলেছে তার দরিদ্র অভিভাবক ও বিদ্যালয়ের শিক্ষক-শিক্ষিকাদের।

বাক-প্রতিবন্ধী এই দুই বোনের নাম ইরিনা আক্তার (১৩) ও শারমিন আক্তার (১২)। তারা চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ড উপজেলার সোনাইছড়ি ইউনিয়নের শীতলপুর এলাকার মো. আজিজ মিয়া ও রোকসানা বেগমের মেয়ে। স্থানীয় মোস্তফা হাকিম কেজি অ্যান্ড জুনিয়র হাই স্কুলের ৭ম শ্রেণির ছাত্রী ওরা।

স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, ইরিনা ও শারমিন অন্য মেয়েদের মতো কথাবার্তা বলতে না পারলেও অন্য সব কিছুতেই তারা যেন একেবারে স্বাভাবিক। প্রথম দেখে কেউ বুঝতেই পারেন না যে ফুটফুটে এ দুটি মেয়ে বাকপ্রতিবন্ধী। বাড়িতে থাকলে গৃহস্থালির টুকিটাকি সব কাজই করে। করে পড়াশোনাও। কিন্তু তাদের এই পড়াশোনা মোটেও সহজ ছিল না। একসময় তাদের অভিভাবকরাও কখনো ভাবেননি যে তাঁরা মেয়েকে স্কুলে পড়াবেন। কারণ, একে তো দারিদ্র্যতার চাপ। এর ওপর বাড়ির কাছাকাছি কোনো মূকস্কুলও নেই। বাকপ্রতিবন্ধীর স্কুল না হলে তারা পড়াশোনা বুঝবে কি-না, অন্য সাধারণ মেয়েদের সাথে মিশবে কি-না-এসব নিয়ে দুশ্চিন্তার শেষ ছিল না মা-বাবার।

সৃষ্টিকর্তা যে তাদেরকে অন্য কোনো দিকেই পিছিয়ে রাখেননি সময়ের সাথে তা প্রমাণ করতে সক্ষম হয় ওই দুই বোন। তারা নিজেরাই স্কুলে যেতে খুব আগ্রহী ছিল। আশপাশের অন্য মেয়েরা স্কুলে যাওয়ার সময়ে তারা দুই বোনও মা-বাবাকে স্কুলে যাওয়ার জন্য বিরক্ত করত। তাদের বাড়ির কাছেই ছিল একটি ব্র্যাক স্কুল। এলাকার ছেলে মেয়েদের সাথে ওই স্কুলে গিয়ে বসে থাকত তারা। এতে বাধ্য হয়ে বাবা আজিজ মিয়া তাদেরকে সেখানে ভর্তি করিয়ে দেন। কিন্তু স্কুলে যেতে দিলে প্রতিবন্ধী এ দুটি মেয়েকে পরীক্ষা দেওয়ার সুযোগ দেয়নি ব্র্যাক স্কুলের শিক্ষকরা। ফলে বাড়িতে এসে কান্নাকাটি জুড়ে দেয় তারা। পরে একদিন আজিজ মিয়া মেয়েদের এ অবস্থার কথা জানান, বাড়ির কাছাকাছি দক্ষিণ সোনাইছড়িতে অবস্থিত মোস্তফা হাকিম কেজি অ্যান্ড জুনিয়র হাইস্কুলের প্রধান শিক্ষক মো. ফরিদুল ইসলামকে।

সব শুনে একদিন প্রধান শিক্ষক নিজেই তাদের বাড়িতে এসে দেখেন মেয়ে দুটি স্কুলে যাওয়ার জন্য কাঁদছে। পড়াশোনার প্রতি তাদের আগ্রহ দেখে তিনি তাদেরকে নিজ স্কুলে তৃতীয় শ্রেণিতে ভর্তি করেন। এরপর থেকে সফলতার সাথেই তারা পড়াশোনা করতে থাকে। শিক্ষকরাও বুঝতে পারেন এ মেয়ে দুটি শুধু কথা বলতে অক্ষম হলেও অন্য কিছুতে মোটেও পিছিয়ে নেই। ক্লাসে শিক্ষকরা যা বলেন তারা তা সহজেই বোঝে নেয়। এভাবে পরীক্ষায় পাস করে এগিয়ে যেতে থাকে তারা। ২০১৬ সালে প্রাথমিক সমাপনী পরীক্ষায় সফলতার সাথে উত্তীর্ণ হয়ে ৬ষ্ঠ শ্রেণিতে ওঠে তারা। বর্তমানে ৭ম শ্রেণিতে পড়ছে এই দুই বোন। ইরিনের রোল নম্বর ৩ আর শারমিনের ৭।

গত সোমবার ইরিনা ও শারমিনের বাড়িতে গিয়ে দেখা যায়, তারা মায়ের সাথে খুবই স্বাভাবিকভাবে কাজকর্ম ও পড়াশোনা করছে। প্রতিবেদক নোটপ্যাড ও কলম বের করে তাদের নাম, শ্রেণি, রোল নম্বর ইত্যাদি জানতে চাইলে তারা লিখে জবাব দেয়। দেখা যায় দুজনের হাতে লেখাও বেশ সুন্দর। এদিন ইশারায় তারা জানায়, স্কুলে অন্য ক্লাসের পরীক্ষা চলায় তাদের ক্লাস বন্ধ আছে। বাবা মো. আজিজ মিয়া বলেন, ‘আমার দুই ছেলে ও তিন মেয়ের মধ্যে ইরিন ও শারমিন জন্মগতভাবে বাকপ্রতিবন্ধী। একদিকে দারিদ্র্যতা আর অন্যদিকে দুটি প্রতিবন্ধী মেয়েকে নিয়ে খুবই দুশ্চিন্তায় আছি।’ তবে তিনি লক্ষ্য করেছেন, ওরা অন্য মেয়েদের চেয়ে কোনো দিকে পিছিয়ে নেই। তিনি বলেন, ‘এরপরও তাদেরকে বিদ্যালয়ে ভর্তি করাব এ চিন্তা করিনি। বাড়ির কাছে কোনো মূকস্কুল নেই। দূরে কোথাও নিয়ে পড়াশোনা করানোর সামর্থ্যও নেই। জুটমিলের স্বল্প বেতনের ওপর ৫ ছেলে-মেয়ে ও স্বামী-স্ত্রী মিলিয়ে ৭ জনের সংসার নির্ভরশীল। অভাব-অনটন লেগেই আছে। মেয়ে দুটি নিজ থেকে বাড়ির কাছের ব্র্যাক স্কুলে গিয়ে বসে থাকত। তাই সেখানে ভর্তি করা হয়। কিন্তু ওই স্কুলের শিক্ষকরা তাদেরকে পরীক্ষা দেওয়ার সুযোগ দেননি। তারা ভেবেছিলেন ওরা পরীক্ষায় কিছু পারবে না। শেষে তারা বাড়ি এসে কান্না শুরু করে। তাদের মন ভালো করার জন্য স্থানীয় মোস্তফা হাকিম কেজি অ্যান্ড জুনিয়র হাই স্কুলের প্রধান শিক্ষকের কাছে গেলে তিনি নিজেই বাড়িতে এসে তাদের অবস্থা দেখেন এবং ভর্তির সুযোগ দেন।’

তিনি জানান, এরপর মেয়ে দুটি নিজেরাই প্রমাণ করেছে যে তারা পড়াশোনায় পিছিয়ে থাকবে না। এখন ইরিন ও শারমিন অন্য সাধারণ মেয়েদের মতোই পড়াশোনা করছে এবং প্রতিটি ক্লাস সফলতার সাথে পাস করে এগিয়ে যাচ্ছে। ফলে শিক্ষকরাও মেয়েদের খুব সহযোগিতা করছেন।

আজিজ মিয়া আরো বলেন, ‘এখন তারা সপ্তম শ্রেণিতে পড়ে। ওদের অবস্থা জেনে মোস্তফা হাকিম ওয়েল ফেয়ার ফাউন্ডেশনের নির্বাহী পরিচালক চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের সাবেক মেয়র মনজুর আলম তাদেরকে নিজ অফিসে ডেকে পাঠান। তাদের সার্বিক অবস্থা শুনে স্কুলের বেতন ও ভর্তি ফি মওকুফ করে দেন। এখন সেভাবেই তারা পড়ছে।’

তবে তাদের বই পুস্তক কেনা ও অন্যান্য খরচ চালান বাবা। মেয়ে দুটিকে একবার কোনো বড় ডাক্তারের কাছে নিয়ে যেতে চান তিনি। আজিজ মিয়ার ধারণা, তারা ছোটবেলা থেকে কানে না শোনায় কথা শিখতে পারেনি। যদি কানে শুনতে পেত তাহলে সবার কথা শুনে শুনে কথা বলতেও পারত। এখন ইরিন ও শারমিন মনে করে সবাই তাদের মতো ইশারায় কথা বলে। তাই তাদেরকে বড় কোনো হাসপাতালে ভর্তি করিয়ে ভালোভাবে চিকিৎসা করাতে চান তিনি। আর তা হলে মনেও শান্তি পেতেন। কিন্তু প্রয়োজনীয় অর্থের অভাবে তা করতে পারছেন না। এ ব্যাপারে কেউ সহায়তা করলে মেয়ে দুটি স্বাভাবিক জীবন ফিরে পাক অথবা না পাক বাবা হিসেবে চেষ্টা করার সান্ত্বনাটুকু পেতেন বলে জানান তিনি। ইরিন ও শারমিনের মা রোকসানা বেগম বলেন, ‘ওরা দুই বোন খুবই প্রাণবন্ত। সবসময় হাসি খুশিতে থাকে। মাঝে-মধ্যে এক দুটি শব্দ করে মা-বাবা বলতে চেষ্টা করে। স্বাভাবিকভাবে তারা কথা বলতে না পারলেও অন্য সব দিকেই তারা অনেক অনেক এগিয়ে। অনেক বিষয় আমার চেয়েও ভালো বোঝে তারা। পড়াশোনার প্রতি অসম্ভব আগ্রহ। বাড়িতে থাকলে পড়ালেখার পাশাপাশি ঘরের কাজও সমান দক্ষতায় সামলায়। এছাড়া খুবই পরিচ্ছন্ন থাকতে চেষ্টা করে। কোথাও একটু অপরিষ্কার দেখলে সাথে সাথেই পরিষ্কার করে।’

মা রোকসানা আরো বলেন, ‘ওদের মেধা খুব ভালো। যদি কথা বলতে পারত তাহলে ওরা অনেককে ডিঙিয়ে ভালো অবস্থান গড়তে পারত। রোকসানা বেগম ও আজিজ মিয়ার অন্য দুই ছেলে ও এক মেয়ে পড়াশোনা করছে। তাই একজনের আয়ে সংসার চালানো কঠিন হয়ে পড়েছে।’

ইরিন ও শারমিনের বিষয়ে জানতে চাইলে মোস্তফা হাকিম কেজি অ্যান্ড জুনিয়র হাই স্কুলের প্রধান শিক্ষক মো. ফরিদুল ইসলাম বলেন, ‘ইরিনা ও শারমিন একসময় ব্র্যাক স্কুলে পড়লেও ওই স্কুলের শিক্ষকেরা তাদেরকে পরীক্ষা দিতে দেয়নি। এজন্য খুব কান্নাকাটি করছিল শুনে আমি গিয়ে তাদেরকে আমার স্কুলে ভর্তির সুযোগ করে দিয়েছি। ভর্তির পর দেখলাম তাদের মেধা ভালো। ইশারাতেই প্রায় সব বোঝতে পারে। বলেও ইশারায়। কিছু না বোঝলে বোর্ডে লিখে দিলে তারা বোঝে নেয়। সকল শিক্ষক এখন তাদের বুঝতে পারেন। সেভাবেই পড়াচ্ছেন তারা। শিক্ষকদের নির্দেশনা বোঝতে পারে বলেই সফলতার সাথে পড়াশোনা করে পাস করে যাচ্ছে।’

৫ম শ্রেণির প্রাথমিক সমাপনী পরীক্ষায় ওরা ভালোভাবেই পাস করে গেছে। ধীরে ধীরে ৭ম শ্রেণিতে ওঠেছে। সামনের জেএসসি পরীক্ষায়ও তারা ভালো ফলাফল করবেন বলে তিনি আশা করেন জানিয়ে প্রধান শিক্ষক আরো বলেন, ‘ইরিন ও শারমিনের কথা জানতে পারার পর মোস্তফা হাকিম ওয়েলফেয়ার ফাউন্ডেশনের নির্বাহী পরিচালক ও সাবেক সিটি মেয়র মনজুর আলম মনজু যতদিন তারা পড়াশোনা করবে তাদেরকে বিনা বেতনে পড়ার ব্যবস্থা করে দিয়েছেন। একদিন তাদেরকে নিজ অফিসে ডেকে তিনি ওদের বাবার কথা শুনে চিকিৎসার ব্যবস্থাও করতে চেয়েছেন। এজন্য একজন বিশেষজ্ঞ ডাক্তারের সাথে কথা বলার পর সেই ডাক্তার বলেছিলেন যে ওরা জম্মগত প্রতিবন্ধী হওয়ায় স্বাভাবিক হওয়ার সম্ভাবনা নেই। এ কারণে তিনি আর এগোতে পারেননি।’

শিক্ষক ফরিদুল ইসলাম বলেন, ‘তবে যতদিন এখানে আছে আমরা তাদের সার্বিক সহযোগিতা করে যাব।’

ইরিন ও শারমিনের প্রতিবেশী বার আউলিয়ার বাসিন্দা সাংবাদিক কামরুল ইসলাম দুলু বলেন, ‘মেয়ে দুটি খুবই হাস্যোজ্জ্বল। তাদের মেধাও খুব ভালো। প্রতিবন্ধী হয়েও সুস্থ ও স্বাভাবিক অন্য ছেলেমেয়ের টেক্কা দিয়ে ভালো ফলাফল করছে। এজন্য আমি মেয়ে দুটি ও তাদের অভিভাবকদেরকে পড়াশোনা অব্যাহত রাখার জন্য সাধ্যমতো সহায়তা করি।’

About pressroom

Check Also

এইচএসসি পরীক্ষার বিষয়ে সিদ্ধান্ত হতে পারে বুধবার

করো’না ভাইরাসের কারণে এ বছরের এইচএসসি ও সমমান পরীক্ষা গত পহেলা এপ্রিল শুরু হওয়ার কথা …

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Powered by keepvid themefull earn money