মাকে একটি ঘর বানিয়ে দেওয়ার স্বপ্ন তৃপ্তির

‘আমার বাবা ছিলেন ভূমিহীন দিনমজুর। ছোটবেলা থেকেই অভাব অনটন আমার নিত্যসঙ্গী।

সংসারে বাড়তি সহায়তার জন্য মা অন্যের বাড়িতে কাজ করতেন। সবে বিশ্ববিদ্যালয়ে পা দিয়েছি। কিডনি ফেইলিওর হয়ে বাবা মারা গেলেন। ’
‘বাবার মৃত্যু আমাকে স্তম্ভিত করে দিল। একই সঙ্গে পরিণত করে দিয়ে গেল। দুই ভাই-বোন, মা; সবার দায়িত্ব। আমি সদ্য বিশ্ববিদ্যালয়ে পা দেওয়া একটি মেয়ে। ’

বাংলানিউজের সঙ্গে নিজের গল্পের সময় এসব কথা বলছিলেন তৃপ্তি পাল। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের পালি ও বুদ্ধিস্ট স্টাডিজ বিভাগে তৃতীয় বর্ষের শিক্ষার্থী তিনি।

তৃপ্তির বিশ্ববিদ্যালয়ের পথচলা অন্য দশজনের মতো নয়। বাবাহীন পরিবারের একমাত্র সম্বল তিনি। পড়াশোনার পাশাপাশি টিউশনি করিয়ে পরিবারের সমস্ত খরচ বহন করছেন।

তার জন্ম নেত্রকোনা জেলার বারহাট্টা উপজেলার আসমা গ্রামে। ছোটবেলা থেকেই আর্থিক অসচ্ছলতা তার যেন সঙ্গী।

অভাব বারবার তার পথ রুখে দাঁড়িয়েছে। তবে অসম্ভব শক্তিশালী মনোবলের এই তরুণী কখনো দমে যাননি। মেধার শক্তি দিয়ে প্রতিকূলতা ডিঙিয়ে পা বাড়িয়েছেন সামনে।

তিনি জানান, ‘ছোটবেলা থেকেই মেধাবী ছিলাম। স্কুল ও কলেজে কখনো দ্বিতীয় হইনি। ফলে পড়াশোনার জন্য বৃত্তি পেতাম। বাবার কষ্ট কিছুটা কমত। ’

কলেজে পড়ার সময় থেকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার স্বপ্ন তৈরি হয় তৃপ্তির মধ্যে। তবে ভর্তি প্রস্তুতির কোচিং করার মতো সামর্থ্য তার ছিল না। ছিল না কোনো ইলেক্ট্রনিক ডিভাইস।

তবুও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির সুযোগ পান তৃপ্তি। কিন্তু টানাপোড়েন যেন পিছু ছাড়ে না। বিশ্ববিদ্যালয়ের ভর্তির জন্য যে টাকার প্রয়োজন, তা তৃপ্তির নেই। পরে মেধা লালন নামক সংস্থার সহযোগিতায় বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হন তিনি।

বিশ্ববিদ্যালয়ে আসার পরই সবচেয়ে বড় ধাক্কার মুখে পড়েন তৃপ্তি। ২০২২ সালে কিডনি ফেইলিওর হয়ে তার বাবা মারা যান।

বাবার মৃত্যুতে হতবিহ্বল হয়ে পড়েন তৃপ্তি। তার চারদিক যেন অন্ধকার হয়ে পড়ে। চার সদস্যের পরিবার। শারীরিক অসুস্থতায় মা আর কাজ করতে পারেন না। বড় মেয়ে হিসেবে পরিবারের গুরুদায়িত্ব যেন তার কাঁধেই। অথচ এ মহাবিপদের সময়ে তার পাশে কেউ নেই।

খুঁটি হিসেবে কাউকে না পাওয়া তৃপ্তি প্রতিজ্ঞা করলেন, নিজেই পরিবারের জন্য খুঁটি হয়ে উঠবেন। তিনি বলেন, ‘আমি আমার পরিবারের শক্তি হওয়ার প্রতিজ্ঞা নিলাম। আমার বোন, চার বছরের ভাই যেন কখনো অনুভব না করে, তাদের পেছনে কোনো খুঁটি নেই; শক্ত হাত নেই। তার যেন ভাবে, দিদি তো আছেই। ’

এখন আধো আধো শব্দে ছোট ভাই যখন তার কাছে কিছু চায়, বড় আনন্দ পান তিনি। মনে হয় যেন খুঁটি হতে পেরেছেন।

পরিবার চালানোর জন্য পড়াশোনার পাশাপাশি চারটি টিউশনি করান তৃপ্তি। এই টাকাতেই চলে তার পরিবার। তিনি স্বপ্ন দেখেন একদিন চাকরি করে মায়ের জন্য একটি ঘর তৈরি করবেন।

পরিবারের পাশাপাশি ছোট দুই ভাই-বোনের পড়াশোনার খরচও দেন তৃপ্তি। মানবিকের শিক্ষার্থী হওয়ায় বোনকে নার্সিংয়ে ডিপ্লোমা করাতে চান। ভাইকে মেডিকেলে পড়ানোর স্বপ্ন তৃপ্তির। যেন সুবিধাবঞ্চিত মানুষকে বিনামূল্যে সেবা দিতে পারেন।

দিনশেষে ঢাকা শহরের কংক্রিটের মাঝে এসব স্বপ্নের পেছনেই ছুটছেন তিনি। শুধু তৃপ্তি নন, এমন অনেক তরুণী রয়েছেন, বাস্তবতা যাদের বেঁধে রাখতে চায়। কিন্তু প্রতিকূলতা ছাপিয়ে তারা নিজের স্বপ্নের দিকে ছুটে চলেন।

তৃপ্তি মনে করেন, নিজের ওপর বিশ্বাস রাখলে যেকোনো প্রতিকূল অবস্থা জয় করা যায়। সৃষ্টিকর্তাও সহায় হন।