Breaking News
Home / Life Style / চাকরি, স্বামী-সংসার রান্নাবান্না সব!

চাকরি, স্বামী-সংসার রান্নাবান্না সব!

মাস্টার্স পাস করার আগে থেকেই চাকরির জন্য পড়াশোনা শুরু করে মোনা। কারণ এখন চাকরি বেশ দুর্লভ। চাকরিই তার লক্ষ্য ছিল, তাই মাস্টার্সের ফল অত ভাল না হলেও, পরীক্ষা পাসের কিছুদিন পরেই এক মাল্টিন্যাশনাল কোম্পানিতে চাকরির সুযোগ হয়। মোনাকে অনার্স পাসের পর থেকেই বিয়ের জন্য চাপাচাপি শুরু হয়, পাশাপাশি পাত্র দেখা। মোনার ইচ্ছার জোরেই সে মাস্টার্স করে এই চাকরি পেয়েছে। এখন অফিস, বাসা সবার এক চিন্তা এবং তা হল তার বিয়ে।

কিছুদিন আগে বাবা-মায়ের চেনা এক ছেলের সাথে দেখা করতে এক রেস্টুরেন্টে তাকে যেতে হয়েছিল। কিন্তু কীভাবে সে অচেনা, অজানা একজনকে চিনবে। আগেকার যুগ এখন আর নেই। এখন পাত্র-পাত্রীদের নিজেদেরকে বোঝার বেশ সুযোগ দেয়া হয়। এজন্য কিছুদিন আগেই সেই ছেলের সাথে তার কিছুদিন ফোনে কথা হয়েছে। তাদের দু’জনের ফেসবুকের মাধ্যমে যোগাযোগ আরও বাড়ে। কিছুদিন ছেলেটির সাথে কথা হয়ে যে পরিচয় হয়েছে তাতে তাদের দু’জনের মতামত বেশ মিলে যায়। তবু দু’দিনের পরিচয়ে কি আর মানুষ চেনা যায়। তারপরও সে গিয়েছিল দেখা করতে। ছেলেটির সাথে নানা প্রসঙ্গে কথা হয়েছিল। সে একটি প্রাইভেট ব্যাংকে রয়েছে। তাদের দু’জনেরই চাকরির সময় শেষ হতে হতে প্রায় রাত আটটা বেজে যায়।

সময়টা ভালই কাটছিল। এমন সময় একদিন ছেলেটি বলল যে, সে যদি এই কোম্পানিতে চাকরি করে তো এমন ব্যস্ততা থাকবেই, তখন ঘরের রান্নাবান্না কে করবে? তার না কি বুয়ার রান্না খাওয়ার অভ্যাস নেই। তাকে নিজ হাতে রান্না করে খাওয়াতে হবে। কিন্তু এই চাকরি যে ছেড়ে দিবে সেটিও সে চায় না। কারণ সংসার একজনের খরচে চলে না, তাই দু’জনের আয়ের টাকা তার নিজের কাছে রাখবে। সেখান থেকে খরচগুলো সে-ই দেখবে। মোনার মনে হচ্ছিল তাহলে এখন একজন মেয়েকে স্ত্রী হিসেবে স্বামী সেবা, রান্নাবান্না করে চাকরিও করতে হবে। মাস শেষে আবার আয়ের সব টাকা স্বামীর হাতে তুলে দিতে হবে। সেটাই এখনকার যুগের কিছু পাত্রের চাহিদা। তারপর মোনার মনে হল যেন তার কাছে জানতে চাচ্ছে, সে কী কী রান্না করতে পারে। আগেকার যুগে যখন পাত্রী দেখতে আসতেন, তখন ছেলেপক্ষের লোকেরা পাত্রীকে এসব প্রশ্নই করত। এমনকি অনেক সময় হেঁটে, গান গেয়ে দেখাতে হত। এখনকার যুগেও সেই একই প্রশ্ন, শুধু হয়তো জায়গাটা আর বাসা নয়, কোনো রেস্টুরেন্ট। এখানে পাত্রই প্রশ্নগুলো করছে।

এখন যুগ অনেক এগিয়েছে। অনেক সময় পাত্র-পাত্রী পরিচিত হতে নানা সামাজিক মাধ্যম, শপিংমল, রেস্টুরেন্ট বেছে নেয়, পরিচিত হবার স্থান হিসেবে। বাবা, মায়েরাও দিয়েছে কিছুটা স্বাধীনতা। নিজ মেয়েকে একজনের সাথে একটু পরিচিত হবার সুযোগ। কিন্তু যুগের চিন্তাধারায় কি কোনো পরিবর্তন এসেছে? আগে পাত্রের বাবা-মা পাত্রী দেখতে আসলে তাকে রান্নাবান্না করে খাওয়াতে হত। গান জানলে গেয়ে শোনাতে হতো। হেঁটে দেখাতে হতো। এখন পাত্র নিজেই সেটি দেখে এবং জানতে চায়। তবে সেই চাহিদার সাথে যেন যুক্ত হয়েছে ভালো পড়াশোনা এবং ভালো চাকরি। যে চাকরির টাকা দিয়ে সংসার চলবে এবং স্ত্রীর কাছ থেকে আগের যুগের মতো সেই সেবাও পাবে। রান্নাবান্নাসহ চাকরি-বাকরি সবই তার করতে হবে। তাই যুগ পাল্টালেও আগেকার দিনের সেই ধারণাগুলো যেন রয়েই গেছে। মোনার মতই অনেককে হয়ত জীবনের এক কঠিন সিদ্ধান্তের সময় এমন ধারণা ও চাহিদাগুলোর সাথে পরিচিত হতে হয়। মোনার পক্ষ থেকে চাহিদা বা প্রশ্ন সবই ছিল খুবই কম, সেই আগের যুগের মত।

তবে সমাজের এই বাধাধরা নিয়ম-কানুন সবার জন্য সত্য নয়। এই চিন্তাধারার বাইরেও ব্যতিক্রম আছে। এই নিয়ম-নীতির বাইরে বের হয়ে যারা এই যুগে, নতুন দৃষ্টিতে নতুন করে জগেক দেখছে। সম্পূর্ণ নতুনভাবে ভাবছে। যেমনটি বলছিলেন লিজা।

আমি কলেজে পড়া শেষ করে অনার্সে ভর্তি হবার আগেই আমার বিয়ে ঠিক হয়ে যায়। আমি প্রায় বাধ্য হয়েই পরিবারের চাপে বিয়ে করি। আমার স্বামী ব্যবসা করত। এক বছরের মতো সময় নষ্ট হলেও অনেক কষ্ট করে পরের বছর অনার্সে এক কলেজে ভর্তি হই। আমার স্বামী চাইত না যে আমি পড়াশোনা করি। বিয়ের এক বছর পার করেই আমাদের পরিবারে নতুন সদস্য হিসেবে আসে আমাদের সন্তান। ধীরে ধীরে আমার স্বামীর কথাবার্তা, কাজকর্মে আমার অসঙ্গতি মনে হতে থাকে। সে অনেক দিনই নানা কাজের কথা বলে বাড়ি আসত না। পরে জানতে পারি যে সে ব্যবসার নামে নানা ধারকর্য করেছে। অনেক মেয়ের সাথেও তার সম্পর্ক রয়েছে। এসর জানার পর আমি কি করব বুঝে পারছিলাম না। একদিকে তিন বছরের শিশু, অন্যদিকে এ দশা। এরপর প্রায় মাতাল হয়ে এসে আমার স্বামী আমাকে অত্যাচার শুরু করে। আঘাতপ্রাপ্ত অবস্থায়, বাবার বাসায় চলে আসি। একসময় বাধ্য হয়েই আমি তাকে ডিভোর্স দিয়ে দিই। আমি আমার ছেলেকে সব ভালোবাসা দিলেও সে তার বাবার সঙ্গ পায়নি। সেই অভাব তাকে বুঝতে হচ্ছিল। আমি পড়াশোনা শেষ করে ব্যাংকে চাকরি পাই। আমিও হয়ে যাই ব্যস্ত। কিন্তু আমারও একাকিত্ব প্রতি মুহূর্তে কষ্ট দিতে থাকে। প্রতি মুহূর্তে সমাজ, পাড়া-প্রতিবেশী সবার নানা প্রশ্নের সম্মুখীন হতে হয়। এসব প্রশ্ন আমার ছেলেকেও শুনতে হয়। যা আমাদের জীবনের পথ আরও কঠিন ও কষ্টের করে তুলতে থাকে।

সেসময় এমবিএ করতে গিয়ে আমার পরিচয় হয় ফয়সালের সাথে। ফয়সাল অন্য একটি ব্যাংকে চাকরি করে। সে আমার চেয়েও পাঁচ-ছয় বছর আগে পাস করে এই ব্যাংকে চাকরি শুরু করেছিল। অনেক দিন হয়ে গেলেও সে বিয়ে করেনি। আমরা দু’জনই নিজেদের অজান্তেই বেশ ভালো বন্ধু হয়ে উঠি। শুধু আমার না, আমার ছেলের সাথেও তার ভাল সম্পর্ক হয়। আমার ছেলে যেন ওর ভক্ত হয়ে পড়ে। ও ধীরে ধীরে আমাদের মা-ছেলের জীবনে যেন আবার আনন্দ ফিরিয়ে আনে। আমাকে একজন দুর্বল, নিঃসঙ্গ নারী হিসেবে না দেখে একজন মানুষ হিসেবে মূল্যায়ন করে। জীবনকে অনুভব করতে শেখায়। একদিন ফয়সাল আমাকে জীবনসঙ্গী হিসেবে গ্রহণ করতে চাইলেও আমার ছেলের কথা মনে করে আমি রাজি হই না। নিজের ভাগ্য মনে করে একাকি নিজেকে সাজা দিতে থাকি। কিন্তু আমার ছেলের আর ওর অনুপ্রেরণাই আমাকে সাহস দেয় এবং এখন আমাদের তিনজনেই এক সুখি পরিবার। ওদের পরিবারের সবাই আমাদের খুব সহজেই আপন করে নিয়েছে এবং মেনেও নিয়েছে। আজকে আমার ছেলে নতুন খেলার সঙ্গীদের পেয়েছে। তার আধাভাঙ্গা পরিবারকে সম্পূর্ণ করতে পেরেছে। প্রথমে এ বিয়ের ব্যাপারে আমাদের পরিবারের অমত থাকলেও এখন তারাও মেনে নিয়েছে। আমি সত্যি এক নতুন জীবন পেয়েছি ওর কাছ থেকে। আমরা এই নতুন পরিবার গড়ে তুলেছি। তাদের প্রতি আমি ও আমার ছেলে চিরকৃতজ্ঞ থাকব।

মেয়েকে মানুষ হিসেবে ভাবার এ ক্ষমতা যদি সবার মাঝেই ছড়িয়ে পড়ত তবে যুগের সাথে তাল মিলিয়ে চিন্তা-চেতনাও সমতালে এগিয়ে যেত।

About pressroom

Check Also

বাড়ির টবেই আলু চাষের সহজ ও কার্যকরী উপায়

বাজারে আলু কিনতে গিয়ে তো হাতে আগুন লাগার জোগাড়। কোথাও চল্লিশ টাকা, আবার কোথাও পঞ্চাশ। …

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Powered by keepvid themefull earn money