৪৩তম বিসিএস ভাইভায় প্রশ্ন : মেগা প্রকল্পে বনভূমি ধ্বংস হলে করণীয় কী

৪৪তম বিসিএসে লিখিত পরীক্ষায় উত্তীর্ণ ১১ হাজার ৭৩২ জন প্রার্থীর মৌখিক পরীক্ষা চলছে। পরীক্ষা চলবে আগামী ৩১ জুলাই পর্যন্ত। এখন প্রতিদিন ৯০ জন করে প্রার্থীর ভাইভা হচ্ছে। ৯ জুলাই থেকে প্রতিদিন ১৮০ জন প্রার্থীর ভাইভা নেবে সরকারি কর্ম কমিশন (পিএসসি)। প্রার্থীদের প্রস্তুতির সুবিধার জন্য আগে যাঁরা মৌখিক পরীক্ষা দিয়ে সফল হয়েছেন, তাঁদের অভিজ্ঞতা প্রথম আলোয় প্রকাশ করা হচ্ছে। নিয়মিত আয়োজনের আজ দ্বিতীয় পর্বে মৌখিক পরীক্ষার অভিজ্ঞতা জানিয়েছেন ৪১তম বিসিএসে কর ক্যাডারে নিয়োগ পাওয়া ও ৪৩তম বিসিএসে পুলিশ ক্যাডারে সুপারিশপ্রাপ্ত মো. সাইফুল হক।

৪১তম বিসিএসে কর ক্যাডারে সুপারিশপ্রাপ্ত হওয়ায় অনেকটা নির্ভার হয়ে ৪৩তম বিসিএসে মৌখিক পরীক্ষা দিতে গিয়েছিলেন মো. সাইফুল হক। ৪৩তম বিসিএসে তাঁর প্রথম পছন্দ ছিল পুলিশ ক্যাডার, চূড়ান্ত ফলে পেয়েছেন পছন্দের ক্যাডারই। গত বছরের ১০ সেপ্টেম্বর ভাইভা হয় সাইফুল হকের। ১৭ থেকে ১৮ মিনিট ভাইভা নেওয়া হয়।

মো. সাইফুল হক বলেন, নিজের প্রস্তুতির ওপর আত্মবিশ্বাসী ছিলাম। তারপরও ভাইভার সময় যত ঘনিয়ে আসছিল, ততই একটা চাপা উত্তেজনা কাজ করছিল। অবশেষে নিজের সিরিয়াল চলে এল। মৌখিক পরীক্ষার কক্ষে প্রবেশ করার পর কর ক্যাডারে সুপারিশপ্রাপ্ত হওয়ার পরও কেন আবার ভাইভা দিতে এসেছি—এমন প্রশ্ন করা হলে উত্তরে সাইফুল হক বলেন, ‘আমার স্বপ্ন পুলিশ ক্যাডারে যোগ দেওয়া। তাই আবার ভাইভা দিতে এসেছি।’

ভাইভা পরীক্ষা দেওয়ার সময়ে সাইফুল হক ফ্রিল্যান্স কনটেন্ট রাইটার হিসেবে কাজ করতেন। এ বিষয়ে তাঁকে বেশ কিছু প্রশ্ন করা হয়। পুরোটাই ইংরেজিতে কথোপকথন হয়। কী কাজ করেন, কীভাবে করেন, সর্বশেষ লেখা কনটেন্ট কী ছিল—এসব খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে জানতে চেয়েছিল।

শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের ফরেস্ট্রি অ্যান্ড এনভায়রনমেন্টাল সায়েন্স বিভাগ থেকে স্নাতক ও স্নাতকোত্তর করেন মো. সাইফুল হক। এটা উল্লেখ করে তাঁকে প্রশ্ন করা হয়, বর্তমানে দেশে বনের অবস্থা কেমন? উত্তরে সাইফুল বলেন, বন বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, দেশে বর্তমানে বনভূমির পরিমাণ ১৫ দশমিক ৫৮ শতাংশ এবং জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থার প্রতিবেদন অনুযায়ী ১৪ দশমিক ১ শতাংশ। কিন্তু দেশে মোট ট্রি কভারেজ ২২ দশমিক ৩৭ শতাংশ।

দুটি প্রতিবেদনে ভিন্নতা কেন—এমন প্রশ্ন করা হলে সাইফুল হক বলেন, দুটি ভিন্ন সময়ে জরিপ/পরিমাপ করা হয়েছিল, তাই দুটি প্রতিবেদনের তথ্যে ভিন্নতা রয়েছে। এর মধ্যে বন বিভাগের তথ্যটা সর্বশেষ তথ্য। বনের পরিমাণ কম, কিন্তু ট্রি কভারেজ বেশি কেন—এর উত্তরে সাইফুল বলেন, বনের বাইরের গাছও এই হিসাবে অন্তর্ভুক্ত, তাই ট্রি কভারেজ বেশি।

দেশে বনভূমির পরিমাণ বাড়ছে না কমছে, পরিবর্তন কী—এসব প্রশ্ন করা হলে পুলিশ ক্যাডারে নিয়োগ পাওয়া সাইফুল বলেন, অনেক জায়গায় বনায়নের এলাকা বাড়ছে আবার অনেক জায়গায় বন ডিগ্রেডেড হচ্ছে। গড়ে বনের পরিমাণ বাড়ছে। এরপর সম্পূরক প্রশ্ন করা হয় বনের পরিমাণ কীভাবে বাড়ছে? তিনি উত্তর দেন, উপকূলীয় এলাকায় কোস্টাল এফরেস্টেশনের মাধ্যমে প্রচুর বনায়ন করা হচ্ছে। এ ছাড়া সোশ্যাল ফরেস্ট্রির মাধ্যমে অনেক বন এলাকায় বাফার জোনে বনায়ন হচ্ছে। তাই ধীরে ধীরে বনের পরিমাণ বৃদ্ধি পাচ্ছে।

বনভূমি, গাছপালা কেন প্রয়োজন? না থাকলে কী হবে? পরিবেশ কী, পরিবেশের ভারসাম্য বলতে কী বোঝেন? এসব প্রশ্নের উত্তরে তিনি বলেন, ‘পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষা করার জন্য দেশের মোট আয়তনের ২৫ শতাংশ বনভূমি থাকা প্রয়োজন। আমাদের চারপাশে সমস্ত কিছু নিয়েই পরিবেশ, যেখানে জীবজগতের সঙ্গে অজৈব উপদানগুলোর পারস্পরিক নির্ভরশীলতা বিদ্যমান। পরিবেশ গঠনকারী সব উপাদানের একটি সুষম সাম্যাবস্থা, যেখানে ইকোসিস্টেমের সব কটি কম্পোনেন্ট ভালোভাবে ফাংশনাল থাকে। এটাই পরিবেশের ভারসাম্য।’

মার্কিন চলচ্চিত্র পরিচালক, প্রযোজক ও অভিনেতা উডি অ্যালেনকে চেনেন কি না—এমন প্রশ্ন করা হলে তিনি ‘না’ উত্তর দেন। এরপর তাঁকে ইংরেজিতে প্রশ্ন করা হয়, উডি অ্যালেন একটি সিনেমায় বলেছিলেন, পৃথিবী একটি বড় রেস্তোরাঁ। এটি ব্যাখ্যা করুন। সাইফুল হক উত্তরে বলেন, ‘রেস্তোরাঁয় মানুষ আসে, খাবার খায় এবং চলে যায়। রেস্তোরাঁর পরিবেশের প্রতি খুব কমই খেয়াল রাখে। একইভাবে পৃথিবীতে আমরা আসি। যা প্রয়োজন, তা–ই নিতে ব্যস্ত থাকি এবং একদিন পৃথিবী থেকে বিদায় নিই। আমরা প্রকৃতিকে শোষণ করি, কিন্তু অধিকাংশ মানুষ প্রকৃতির বিষয়ে চিন্তা করি না। আমরা আমাদের কাজের পরিণতি সম্পর্কে চিন্তা করি না। এই অর্থে এটি বলা যেতে পারে যে পৃথিবী একটি বড় রেস্তোরাঁ।’

সম্প্রতি প্রধানমন্ত্রীর একটি বিশেষ উদ্যোগ আন্তর্জাতিকভাবে প্রশংসিত হয়েছে। বলতে পারবেন সেটি কী? এর উত্তরে সাইফুল হক বলেন, আশ্রয়ণ প্রকল্প। প্রত্যুত্তরে বলা হয়, আশ্রয়ণ প্রকল্পও অনেক রিমার্কেবল একটি উদ্যোগ। কিন্তু এটি নয়। আপনাকে একটু হেল্প করি। উদ্যোগটি স্বাস্থ্য–সম্পর্কিত। তখন সাইফুল হক বলেন, কমিউনিটি ক্লিনিক।
এরপর কমিউনিটি ক্লিনিক সম্পর্কে বলতে বলা হয়। সাইফুল হক বলেন, প্রান্তিক পর্যায়ে দেশের জনগণের দোরগোড়ায় অতি প্রয়োজনীয় স্বাস্থ্যসেবা পৌঁছে দেওয়ার জন্য এ উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। সরকারি-বেসরকারি অংশীদারত্বের মতো এখানে জনগণ জমি দিচ্ছে এবং সরকার ইনফ্রাস্ট্রাকচার সাপোর্টসহ যাবতীয় সেবা দিচ্ছে। প্রান্তিক জনগণ, যারা জরুরি মুহূর্তে উন্নত স্বাস্থ্যসেবা থেকে বঞ্চিত ছিল, তারা নিজ এলাকাতেই দ্রুত ইমারজেন্সি সাপোর্ট পাচ্ছে। মাতৃমৃত্যুর হার অনেক কমে এসেছে এর ফলে।

দেশে অনেক মেগা প্রকল্প হচ্ছে। কিছু প্রকল্প বনভূমি ধ্বংস করে হচ্ছে। বায়োডাইভার্সিটি (জীববৈচিত্র্য) নষ্ট হচ্ছে। তাহলে কী করা যায়? এর উত্তরে তিনি বলেন, দেশের উন্নয়নের জন্য মেগা প্রজেক্টগুলো অবশ্যই দরকার। কিন্তু এর ফলে যে পরিবেশগত ক্ষতি হচ্ছে, তা প্রশমন এবং ক্ষেত্রবিশেষে অভিযোজন কৌশলের মাধ্যমে অনেকটাই ক্ষতিপূরণ করা সম্ভব।

প্রশমন কীভাবে হতে পারে? এমন প্রশ্নের উত্তরে বলেন, অন্যত্র ব্যাপক বনায়নের মাধ্যমে বনভূমি ধ্বংসের ক্ষতি প্রশমন করা সম্ভব। কিন্তু বায়োডাইভার্সিটি (জীববৈচিত্র্য) যে নষ্ট হবে, তার কী করা যায়? এ প্রশ্নের জবাবে সাইফুল হক বলেন, এ ক্ষেত্রে জীববৈচিত্র্যসমৃদ্ধ এলাকা ও বনভূমি যতটা সম্ভব এড়িয়ে এবং পরিবেশগত প্রভাব কমিয়ে প্রকল্পগুলো বাস্তবায়ন করা উচিত।