প্রথম বিসিএসেই প্রশাসন ক্যাডার হলেন মিনহাজুল ইসলাম

ডিভিএমে পড়াশোনা করেছি চট্টগ্রাম ভেটেরিনারি ও এনিম্যাল সায়েন্সেস বিশ্ববিদ্যালয় (সিভাসু) থেকে। ৪০তম বিসিএসই ছিল আমার প্রথম বিসিএস। অনার্স তৃতীয় বর্ষ থেকে একাডেমিক পড়াশোনার পাশাপাশি অল্প অল্প করে বিসিএস প্রস্তুতি শুরু করি। একাডেমিক ক্লাসের পর সপ্তাহে প্রায় তিন দিন বিসিএস প্রিলিমিনারির কোচিং করতাম। গ্র্যাজুয়েশন শেষ করার পর একাডেমিক পড়াশোনার চাপ না থাকায় শুধু বিসিএসের দিকেই পুরো সময় দেওয়া শুরু করি। বিশ্ববিদ্যালয়ের পাঁচ বন্ধুও আমার সঙ্গেই প্রস্তুতি শুরু করেছিল। নিজেদের মধ্যে এক রকম প্রতিযোগিতা চলে আসে! তখন মনে মনে বিসিএসই ছিল আমাদের একমাত্র লক্ষ্য। এরপর পরীক্ষার সময়-সুযোগ সামনে আসে। আমার প্রথম বিসিএস ছিল ৪০তম। এই বিসিএসের চূড়ান্ত ফলাফল হওয়ার আগে ৪১তম ও ৪৩তম বিসিএসে অংশ নেওয়ারও সুযোগ হয়। সবগুলোর প্রিলিমিনারিতে উত্তীর্ণ হই।

সে অনুযায়ী লাইব্রেরি থেকে বই সংগ্রহ করি। প্রিলিমিনারি প্রস্তুতির ক্ষেত্রে গণিত, মানসিক দক্ষতা, বিজ্ঞান, কম্পিউটার ও ভূগোল—এই বিষয়গুলোকে প্রাধান্য দিয়ে প্রস্তুতি নিয়েছিলাম। বিভিন্ন প্রকাশনীর গাইড বই পড়ার পাশাপাশি বাংলা ব্যাকরণ, কম্পিউটার ও বিজ্ঞানের নবম-দশম শ্রেণির বোর্ড বই অনুসরণ করেছিলাম। বাংলা সাহিত্যের জন্য পিএসসি নির্ধারিত ১১ জন লেখকসহ মোট ৬৫ থেকে ৭০ জন লেখকের সাহিত্যকর্ম, মুক্তিযুদ্ধ ও ভাষা আন্দোলনভিত্তিক সাহিত্যকর্ম এবং বিভিন্ন পত্রিকার সম্পাদকের নাম পড়েছিলাম। বাংলা ব্যাকরণের জন্য নবম-দশম শ্রেণির বোর্ড বই, সঙ্গে সৌমিত্র শেখরের বই থেকে শব্দ, সন্ধি, বাগধারা, এককথায় প্রকাশ, সমার্থক ও বিপরীত শব্দ ইত্যাদি অংশ পড়েছিলাম।

ইংরেজি ভাষা অংশের ক্ষেত্রে Determiner,Gender,Number, Phrase & Idioms, Preposition, Clause, Phrase, Sub-verb agreement ইত্যাদি ঝালাই করে নিয়েছিলাম। ইংরেজি সাহিত্য অংশের জন্য শরীফ স্যারের বইটা খুব ভালোভাবে পড়েছিলাম। তবে আধুনিক যুগ থেকে শুধু বিগত বছরের প্রশ্ন পড়েছিলাম। মানসিক দক্ষতার ক্ষেত্রে একটি বই প্রিলি ও রিটেনের জন্য যথেষ্ট সে রকম বই বেছে নিয়েছিলাম। ভূগোলে মার্কস তোলা তূলনামূলক সহজ। ভূগোলের জন্য একটি গাইড বই ও নবম-দশম শ্রেণির ভূগোল বই পড়েছিলাম। বিজ্ঞান অংশের জন্য একটি গাইড বই এবং নবম-দশম শ্রেণির সাধারণ বিজ্ঞান, পদার্থ, রসায়ন ও জীববিজ্ঞান থেকে সিলেবাস রিলেটেড অংশ পড়েছিলাম। কম্পিউটার অংশের জন্য একটি গাইড বই ও নবম-দশম শ্রেণির কম্পিউটার বইটি পড়েছিলাম। গণিতের জন্য একটি গাইড বই ও ১৯৮৭ (সম্ভবত) সালের নবম-দশম শ্রেণির গণিত বোর্ড বই পড়েছিলাম। বাংলাদেশ বিষয়াবলির জন্য অনেক গাইড বই পড়েছি। এ ছাড়া নবম-দশম শ্রেণির সমাজবিজ্ঞান (যেহেতু অনার্স তৃতীয় বর্ষ থেকে পড়েছি, অনেক সময় পেয়েছিলাম, তবে প্রিলির জন্য যেকোনো এক প্রকাশনীর বই পড়লেই হয়)। আন্তর্জাতিক বিষয়াবলির জন্য ২টি গাইড বই পড়েছিলাম। নৈতিকতা ও সুশাসনের জন্য ১০ পৃষ্ঠার মতো পড়েছিলাম, এটাই যথেষ্ট! ৪০তম বিসিএস প্রিলিমিনারিতে একটি ডাইজেস্ট বই পড়েছিলাম। আমার বিভিন্ন বই পড়তে ভালো লাগত। আমি একটা প্রকাশনীর বইকে মূল বই ধরে অন্যান্য বই থেকে প্রাপ্ত গুরুত্বপূর্ণ তথ্যগুলো এই মূল বইয়ের সংশ্লিষ্ট অংশের পাশে তুলে রাখতাম। ৪৩তম প্রিলিমিনারি মাত্র দুই দিন (ইংরেজি সাহিত্য ও পরীক্ষার দিন সকালে সুশাসন) পড়েছিলাম। ৪৩তম প্রিলিমিনারি ছেড়েই দিয়েছিলাম, তবে আগের প্রস্তুতি ভাগ্যক্রমে উতরে যাই। সময় নিয়ে প্রিলিমিনারি প্রস্তুতি নিলে কিছু উপকার পাওয়া যায়, যা প্রথম বিসিএসের পর থেকে আঁচ করা যায়।

৪০তম বিসিএস প্রিলিমিনারি পরীক্ষার আগে থেকে মডেল টেস্ট দেওয়া শুরু করি, যা আমাকে সময় ব্যবস্থাপনা ও নেগেটিভ মার্কস কমাতে সহায়তা করে। কোন প্রশ্নে আমাকে কয়টা দাগাতে হবে এবং আমার কয়টা ভুল হতে পারে, তা আমি কোচিংয়ে মডেল টেস্ট দিয়ে বুঝতে পেরেছিলাম।

আমার ভুল হতো বেশি, তাই আমি বেশি দাগাতাম। অনেকে ১২০টা দাগালে দেখা যায় ১১৮টা হয়; কিন্তু আমার ক্ষেত্রে ১৪৫টা দাগালে ১১৫-এর আশপাশে মার্কস চলে আসে। এ ক্ষেত্রে অন্যদের মতো ১২০টা দাগালে আমাকে ডুবতে হবে, তা আমি মডেল টেস্ট দিয়ে বুঝতে পেরেছিলাম

লিখিত প্রস্তুতির জন্য হাতে সময় কম থাকে, তবে কৌশল অবলম্বন করে প্রস্তুতি নিতে পারলে এই সময়টুকুই যথেষ্ট। বিগত বছরের প্রশ্নগুলো ও সিলেবাস বিশ্লেষণ করলে দেখা যায় কিছু বিষয় আছে, যেগুলোতে ভালো নম্বর তোলার সুযোগ রয়েছে, সেগুলোর ওপর জোর দিয়েছিলাম। অর্থনৈতিক সমীক্ষা ও পত্রিকা থেকে বিভিন্ন ডাটা, উক্তি ও চলমান বৈশ্বিক ঘটনাগুলোর ওপর নোট তৈরি করেছিলাম।
করোনার কারণে বিভিন্ন চাকরির পরীক্ষাগুলো স্থগিত হওয়ায় ও ৪০তম বিসিএস ভাইভার তারিখ বারবার পিছিয়ে যাওয়ায় মানসিকভাবে কিছুটা দুর্বল হয়ে পড়েছিলাম। তার পরও ৪০তম বিসিএস ভাইভা ও ৪১তম বিসিএসের প্রস্তুতি নিতে থাকি। প্রস্তুতি নেওয়াটা আরো চ্যালেঞ্জিং হয়ে পড়ে যখন ৪০তম ভাইভা পরীক্ষার (১৪ নভেম্বর ২০২১) ১৫ দিন আগে ৪৩তম বিসিএস প্রিলিমিনারি (২৯ অক্টোবর ২০২১) এবং ১৫ দিন পর ৪১তম বিসিএস রিটেন পরীক্ষার (২৯ নভেম্বর ২০২১) তারিখ নির্ধারিত হয়। মাত্র এক মাসের মধ্যে প্রিলিমিনারি, রিটেন ও ভাইভা পরীক্ষা একসঙ্গে মোকাবেলা করাটা সত্যিই খুব কষ্টকর ছিল। তার পরও রুটিনমাফিক পড়াশোনা করে প্রস্তুতি গুছিয়ে নিয়েছিলাম।

ভাইভার প্রস্তুতি নেওয়ার ক্ষেত্রে নমুনা ভাইভা দিতাম। আমার স্ত্রী প্রশ্ন করত, আমি উত্তর দিতাম। বাসায় এভাবে নিয়মিত ভাইভা চর্চা করার ফলে পরবর্তী সময়ে ভাইভা বোর্ডে আমার তেমন নার্ভাস লাগেনি। এরপর ৪০তম বিসিএসের চূড়ান্ত ফলাফল প্রকাশ হলো, আমার রোলটা পেলাম প্রশাসন ক্যাডারের তালিকায়। ✍️✍️✍️ গ্রন্থনা : এম এম মুজাহিদ উদ্দীন, চাকরি আছে , কালের কন্ঠ, ৯/৭/২২

Leave a Comment