শরবত বিক্রির ফাঁকে চলছে বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির প্রস্তুতি

শরবতের দোকানে বই। যখন ক্রেতার ভিড় কমে আসে, তখন দোকানি বইটি মেলে বসেন। সড়কবাতির আলোতে পড়াশোনা করেন। এভাবেই বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির প্রস্তুতি নিচ্ছেন তিনি।

এই শরবত বিক্রেতার নাম মো. সাদেকুল ইসলাম (১৯)। তাঁর বাবার নাম মো. জার্জিস আলী। তাঁর বাড়ি রাজশাহীর গোদাগাড়ী উপজেলার পশ্চিম বামনাইল গ্রামে। ১১ ভাইবোনের মধ্যে সাদেকুল সবচেয়ে ছোট। অন্য ভাইবোনেরা যে যার মতো থাকেন। ছোটবেলায় সাদেকুলকে হাফেজিয়া পড়ার জন্য রাজশাহী নগরের একটি মাদ্রাসায় ভর্তি করে দেওয়া হয়। পরে তিনি নগরের উপর ভদ্রা এলাকার মদিনাতুল উলুম কামিল মাদ্রাসা থেকে ২০১৮ সালে বিজ্ঞান বিভাগে দাখিল পাস করেন।

বিজ্ঞান বিভাগের পড়াশোনার খরচ জোগাড় করতে না পারায় উচ্চমাধ্যমিক পর্যায়ে এসে বিজ্ঞান ছেড়ে মানবিক বিভাগ নিয়ে পড়াশোনা করেন। ২০২০ সালে তিনি আলিম পাস করেন। এসএসসি ও এইচএসসি সমমানের দুই পরীক্ষায় তাঁর জিপিএ-৫ আছে। তাই ভর্তির সুযোগ পাওয়ার ব্যাপারে তিনি আশাবাদী।

পাঁচ বছর ধরে গরমের মৌসুমে শরবতের ভ্রাম্যমাণ ভ্যান নিয়ে সাদেকুলকে রাজশাহী রেলস্টেশনের পাশে দেখা যায়। এই বেচাবিক্রি থেকে যে আয় হয়, তা দিয়েই তাঁর পড়াশোনার খরচ জোগাড় করেন।

মদিনাতুল উলুম কামিল মাদ্রাসার বাংলা বিভাগের সহকারী অধ্যাপক এ কে এম সালাহ উদ্দিন প্রথম আলোকে বলেন, সাদেকুল ইসলাম খুবই পরিশ্রমী, ভালো ছেলে ও মেধাবী। সে এ শহরে থেকে অনেক কষ্ট করে পড়াশোনা করে।

গত সোমবার সন্ধ্যায় কথা হয় সাদেকুল ইসলামের সঙ্গে। তিনি বলেন, হাফেজিয়া শেষ করার পর থেকে তিনি বসে থাকেননি। কাজ খুঁজেছেন। টিউশনি করে পড়াশোনার খরচ জোগাড় করেছেন। সঙ্গে অন্যান্য কাজ করার চেষ্টা করেছেন। তিনি নগরের বালিয়াপুকুর এলাকায় থাকেন। এ এলাকায় নওগাঁর কয়েক ছেলে ভ্যানগাড়িতে করে শরবতের ব্যবসা করতেন। তাঁদের কাছ থেকে শরবতের ব্যবসার ধারণা নিয়ে ব্যবসা শুরু করেন তিনি। প্রতিদিন সকালে রাজশাহী রেলগেট এলাকায় এবং সন্ধ্যার পর রেলস্টেশনের প্রবেশমুখে তাঁর গাড়ি থাকে।

সাদেকুলের এক গ্লাস শরবতের দাম ১০ টাকা। পানি ঠান্ডা করার জন্য প্রতিদিন ৭০ টাকা দিয়ে তাঁকে একটি বরফের চাঁই কিনতে হয়। সেই সঙ্গে লাগে লেবু ও শরবতের জন্য তৈরি চিনির পাউডার। তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, যখন খুব বেশি গরম পড়ে, তখন শরবতের চাহিদা বাড়ে। প্রতিদিন ১০০–১৫০ গ্লাস শরবত বিক্রি হয়। শরবতের ব্যবসা শুরু করার পর থেকে নগরের বালিয়াপুকুর এলাকায় মাসিক দুই হাজার টাকা ভাড়ায় একটি কক্ষ নিয়ে থাকে তিনি। নিজের পড়াশোনার খরচ চালানোর পাশাপাশি এখন এ ব্যবসা থেকে মা–বাবাকেও তিনি সহযোগিতা করেন।

আর কিছুদিন পর শীত নামবে। শরবতের ব্যবসা চলবে না। তখন কী করবেন, জানতে চাইলে সাদেকুল বলেন, ‘আগাম ফুডপান্ডায় যোগদান করেছি। তাঁরা ক্লাস ও পড়াশোনার সময়ের সঙ্গে সমন্বয় করে কাজ করার সুযোগ দেয়।’

সাদেকুলের রাষ্ট্রবিজ্ঞান, অর্থনীতি, ইতিহাস, ইসলামের ইতিহাস—এসব বিষয় নিয়ে পড়ার আগ্রহ আছে। ইতিমধ্যে সাদেকুল রাজশাহী সিটি কলেজে রাষ্ট্রবিজ্ঞানে ভর্তি হয়েছেন। তবে স্বপ্ন দেখেন আরও ভালো শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে পড়ার।

About pressroom

Check Also

ধামইরহাটে দোতলা মাটির এসি বাড়ি দেখতে কৌতুহলী মানুষের ভীড়

নওগাঁর ধামইরহাটে মাটির দোতলা এসি বাড়ী দেখতে কৌতুহলী মানুষের ভীড় বেড়েই চলছে। উপজেলার আড়ানগর ইউনিয়নের …

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *