Breaking News

চ্যালেঞ্জ থেকেই বিসিএস ক্যাডার হলেন শিপন আলী

এসআই হওয়ার স্বপ্ন দেখতেন তিনি ছোটকাল থেকেই। তাই অনার্স চূড়ান্ত পরীক্ষা শেষ হতেই এসআই নিয়োগ পরীক্ষায় অংশ নিয়েছিলেন তিনি। পরিবার, পাড়া-প্রতিবেশী সবাই ধরে নিয়েছিল তিনি এসআই হয়ে যাবেন, তাই অন্য জবের প্রস্তুতিও নেননি। কিন্তু যখন স্বপ্নের এ পরীক্ষায় অকৃতকার্য হলেন, তখনই তার মনটা ভেঙ্গে খান খান হয়ে গেল। মনে অনেকটা জেদ নিয়েই বিসিএসের প্রস্তুতি শুরু করলেন তিনি।

বন্ধু-বান্ধবের উৎসাহ-অনুপ্রেরণা আর প্রবল ইচ্ছাশক্তিতে প্রথমবারেই বাজিমাত করেছেন তিনি। সবাইকে তাক লাগিয়ে বাংলাদেশ সিভিল সার্ভিসের (বিসিএস) ৩৮তম ব্যাচের শিক্ষা ক্যাডারে নিয়োগের জন্য সুপারিশপ্রাপ্ত হয়েছেন শিপন আলী।৩৮তম বিসিএসে শিক্ষা ক্যাডারে সারাদেশের মধ্যে তার সাবজেক্টে ১১তম হয়েছেন ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ের (ইবি) পঁচিশতম ব্যাচের শিক্ষার্থী শিপন আলী। তিনি কুষ্টিয়ার দৌলতপুর উপজেলার গোয়ালগ্রামের এক মধ্যবিত্ত কৃষক পরিবারের ছেলে। বর্তমানে শিপন অত্র উপজেলার চর ভবানন্দদিয়াড় সরকারী প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক হিসেবে কর্মরত রয়েছেন।

তিন ভাই দুই বোনের মধ্যে সবার ছোট তিনি। শিপনের বাবা একজন কৃষক এবং মা গৃহিণী। বাবার আর্থিক অবস্থা ভালো না হওয়ায় তাদের পরিবারে অভাব-অনটন লেগেই থাকত সবসময়। শৈশব থেকেই তার লেখাপড়ার প্রতি প্রবল আগ্রহ ছিলো । কিন্তু তেমন দিক নির্দেশনা না পাওয়ায় ভালো ছাত্রত্বের পরিচয় বহন করতে পারেননি শিপন। তাই মাধ্যমিক পর্যায়ের প্রায় প্রতি ক্লাসেই ইংরেজি-গণিতে বরাবরই অকৃতকার্য হতেন তিনি। কিন্তু ভাগ্যক্রমে এসএসসি’র মূল্যায়ন পরীক্ষায় সব বিষয়ে কৃতকার্য হয়েছিলেন শিপন। ২০০৭ সালে স্থানীয় গোয়াল গ্রাম মাধ্যমিক বিদ্যালয় থেকে মানবিক বিভাগে এসএসসিতে জিপিএ ৩.১৩ পেয়ে উত্তীর্ণ হন তিনি। রেজাল্ট খারাপ হওয়া সত্ত্বেও তখন থেকেই লেখাপড়ার প্রতি তার প্রবল আগ্রহ জমতে থাকে। পরে ২০০৯ সালে গোয়ালগ্রাম কলেজ থেকে মানবিক বিভাগ থেকে জিপিএ ৪.৪০ পেয়ে উচ্চমাধ্যমিক পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হন তিনি।

এরপর যখন বন্ধুরা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভর্তি পরীক্ষায় অংশ নিতে গ্রামের বাইরে পা রাখে, তখন তিনিও তাদের সঙ্গে কুষ্টিয়া শহরে চলে আসেন। পরে সেখানে বিশ্ববিদ্যালয় ভর্তি কোচিংয়ে ভর্তি হন। তার পড়াশুনার যাবতীয় ব্যয়ভার বহন করতেন তার বাবা-মা এবং বড় ভাই। তাদের কষ্টার্জিত টাকা খরচ করে তিনি জীবনে বড় হওয়ার স্বপ্ন দেখতেন।

প্রথমবার পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হতে ব্যর্থ হলেও দ্বিতীয়বার ইবি, জবিসহ বেশ কিছু বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার সুযোগ পেয়েছিলেন তিনি। পরে তিনি ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ে ২০১০-১১ শিক্ষাবর্ষের শিক্ষার্থী হয়ে বাংলা বিভাগে ভর্তি হন এবং অনার্সে সিজিপিএ- ৩.৩৬ অর্জন করেন। পরে ২০১৪-১৫ শিক্ষাবর্ষে মাস্টার্সে ভর্তি হয়ে সিজিপিএ -৩.৩১ অর্জন করেন। তবে রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতার কারণে মাস্টার্স প্রোগ্রাম শেষ করতে প্রায় দুই বছর বেশি লেগে যায় বলে জানালেন শিপন।

স্বপ্ন ছোঁয়ার কথা জানিয়ে শিপন বলেন, বিশ্ববিদ্যালয় জীবনে এক মেয়ের প্রেমে পড়ে যাই। কিন্তু তার বাবা বিসিএস ক্যাডারের সাথে মেয়েকে বিয়ে দিতে চায়। তখন বিষয়টি আমার কাছে খুব চ্যালেঞ্জিং হয়ে ওঠে। একদিকে এসআই না হওয়ার মনঃকষ্ট, অন্যদিকে তার বাবার ইচ্ছাপূরণ। পরে তার ও কাছের কিছু বন্ধুদের উৎসাহ-অনুপ্রেরণা পেয়ে ক্যাডার হওয়ার স্বপ্ন দেখি। এ স্বপ্ন একসময় দানা বাঁধতে শুরু করে। মনে অনেকটা জেদ নিয়ে ২০১৭ সালের সেপ্টেম্বরে আমি ঢাকায় চলে আসি। পরে সেখানে অদিতি কোচিংয়ে ভর্তি হই। এ স্বপ্ন পূরণ করতে আমাকে অনেক পরিশ্রম করতে হয়েছে।

প্রতিদিন ১০-১২ ঘন্টা করে পড়ালেখা করতাম এবং যা পড়তাম তাই লিখতাম। কঠিন বিষয়গুলো বারবার আয়ত্ত করতাম এবং নোট করতাম। এভাবে আমি বিসিএসের প্রস্তুতি সম্পন্ন করি। পরে ২০১৭ সালের ২৯ ডিসেম্বরে ৩৮ তম বিসিএসের প্রিলিতে অংশ নিই। প্রিলির প্রায় আট মাস পর লিখিত পরীক্ষা দেই। তারও প্রায় এক বছর দুই মাস পর ভাইভাতে অংশগ্রহণ করি। অবশেষে গত ৩০ জুন ৩৮ তম বিসিএসে শিক্ষা ক্যাডারে বাংলাতে ১১তম মেধা তালিকায় সুপারিশপ্রাপ্ত হয়েছি। তবে ৩৮’র পরে ৪০ তম বিসিএস’র লিখিত পরীক্ষাতেও অংশগ্রহণ করেছিলাম।

অনেকটা আবেগে আপ্লুত হয়ে তিনি বলেন, যে মেয়ে আমাকে সফল হতে উৎসাহ-অনুপ্রেরণা জোগাত, সে এখন অনেক দূরে এক ব্যাংকারের সাথে আছে। তার অনুপ্রেরণা আমাকে এ পর্যন্ত এনেছে।স্বপ্ন জয়ের অনুভূতির কথা জানতে চাইলে শিপন বলেন, বিসিএস মানেই একটি স্বপ্ন। সেই স্বপ্ন যখন বাস্তবে পরিণত হয়, সেই অনুভূতিটা ভাষায় প্রকাশ করা যায় না। বিসিএস মানেই ধৈর্যের পরীক্ষা। তাই ধৈর্য ধরে নিদিষ্ট লক্ষ্য ঠিক করে সফলতা পাওয়ার লক্ষ্যে নিয়মিত অধ্যয়ন করলে, স্রষ্টাকে ডাকলে সফলতা আসবেই।

আমার বিসিএস জয়ের সংবাদ শুনে বাবা- মা, বড় ভাই এতোটাই আবেগে আপ্লুত হয়েছিল যে খুশিতে তাদের চোখের পানি চলে এসেছিল। আমার এ সফলতার পেছনে অনেকাংশে অবদান রেখেছেন আমার বড় ভাই রেমিটেন্স যোদ্ধা। তিনি অর্থ দিয়ে, মানসিক সাহস দিয়ে আমাকে এগিয়ে যেতে সাহায্য করেছেন। আমার বন্ধুরা টিউশনি করলেও ভাই আমাকে কোনদিন অর্থনৈতিক চাপ দেননি। তার ভালবাসার কথা কয়েক পাতায় লিখে প্রকাশ করা সম্ভব না। এমন ভাই যেন প্রতিটি পরিবারে থাকে। আল্লাহ যেন আমাকে আমার পরিবারের সেবা করার সামর্থ্য দান করেন।

ভবিষ্যৎ পরিকল্পনার কথা তিনি বলেন, দেশ ও জাতি গঠনে কাজ করা, দুঃস্থদের সেবা করা এবং যুব সমাজকে দেশ গঠনে উৎসাহিত করাই আমার ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা। বিসিএস ক্যাডার না হয়েও সমাজ, দেশ ও জাতির জন্য ভালো কিছু করা যায়। এটা মানসিক ব্যাপার। তাই মানসিকভাবে প্রস্তুতি নিতে হবে সমাজ, দেশ ও জাতির সেবা করার। যেটা সব জায়গা থেকেই করা সম্ভব- জানালেন শিপন।

About pressroom

Check Also

বিসিএস পুলিশ ক্যাডারে একই ব্যাচে আপন দুই ভাই

বিসিএস পুলিশ ক্যাডারে নিয়োগ পেয়েছিলেন আপন দুই ভাই। তবে এরকম ঘটনা বাংলাদেশ পুলিশের ইতিহাসে সেটাই …

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *