দুইবারে এইচএসসি পাস করলেও প্রথমবারে বিসিএস ক্যাডার হলেন ঢাকা কলেজের রাফসান

সাতক্ষীরা সরকারি কলেজ থেকে ২০০৮ সালে এইচএসসি পরীক্ষা দিয়ে ফেল করি। পরের বছর আবার পরীক্ষায় অংশ নিয়ে পাস (জিপিএ ৩.৫০) করি। ২০০৯-১০ শিক্ষাবর্ষে জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনে ঢাকা কলেজে ভর্তি পরীক্ষায় অংশ নিই। তবে ওয়েটিং লিস্টেও জায়গা করতে পারিনি। দ্বিতীয়বার সেখানে আবারও পরীক্ষা দিয়ে প্রাণিবিদ্যা বিভাগে ভর্তির সুযোগ পাই।

কিন্তু জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ে এই বিষয় নিয়ে পড়াশোনা করে কোনো চাকরি পাব কি না—এ নিয়ে আশপাশের মানুষজন নেতিবাচক কথা বলত। কিন্তু আমি জেদ করি, যে করেই হোক, বিসিএসে ভালো করতেই হবে! অনার্স তৃতীয় বর্ষের পর থেকেই বিসিএসের প্রস্তুতি শুরু করি। বিসিএসকে সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দিলেও বিকল্প হিসেবে ব্যাংক, শিক্ষক নিবন্ধন ও অন্যান্য চাকরির নিয়োগ পরীক্ষারও প্রস্তুতি নিয়েছি। জব সলিউশন বই শেষ করে ফেলি অনার্স ফাইনাল পরীক্ষার আগেই। যতটুকু পড়তাম তা লিখে রাখতাম এবং গুরুত্বপূর্ণ টপিক বা বিষয়বস্তু নোট করে রাখতাম।

অনার্স ফাইনাল পরীক্ষা দেওয়ার পর বিসিএসের বিষয়ভিত্তিক বিভিন্ন বই, বিভিন্ন রেফারেন্স বই যেমন—বিশ্বরাজনীতি, মধ্যপ্রাচ্য, আন্তর্জাতিক সম্পর্ক ইত্যাদি পড়েছি। এ ছাড়া আন্তর্জাতিক বিষয়াবলি, বাংলাদেশ বিষয়াবলির বিভিন্ন বই, সাময়িকীও কিনে পড়তাম। প্রতিদিন একটি বাংলা জাতীয় দৈনিক এবং প্রতি শুক্রবার একটি ইংরেজি জাতীয় দৈনিক পত্রিকা নিতাম।

ইংরেজি পত্রিকাটি সারা সপ্তাহ ধরে পড়তাম। ফলে বিভিন্ন তথ্য সম্পর্কে আপডেট থাকার পাশাপাশি ইংরেজি অনেকটা আয়ত্তে চলে আসে।
শনিবার থেকে বৃহস্পতিবার যা যা পড়তাম, শুক্রবার সেগুলো রিভিশন দিতাম। নিজের প্রস্তুতি যাচাইয়ের জন্য বেশি বেশি মডেল টেস্ট দিতাম। বিসিএস প্রিলিমিনারিতে বাংলা, ইংরেজি, গণিত (১০০ নম্বর বরাদ্দ) এই তিন বিষয়ের ওপর বেশি জোর দিয়েছি।

দুর্বলতা কাটানোর জন্য প্রতিদিনের রুটিনে তিন ঘণ্টার চেয়েও বেশি সময় দিয়েছি ইংরেজিতে। ঘুম থেকে উঠে অন্তত পাঁচটি ইংরেজি শব্দ পড়ে লিখে রাখতাম। সিলেবাস ধরে গ্রামারের টপিকগুলো অনুশীলনের সময়ও নোট করেছি। প্রতিদিন দুজন সাহিত্যিক ও তাঁদের সাহিত্যকর্ম পড়া ছিল রুটিনের অংশ। প্রশ্ন বিশ্লেষণ করে দেখেছি গ্রামার অংশের Parts of speech, determiner, Verb, preposition, Idioms and Phrase, Clasue, Synonyms and antonyms, Sentence, Transformation ইত্যাদি টপিকের ওপর তুলনামূলক বেশি প্রশ্ন থাকে। তাই গুরুত্বপূর্ণ এই টপিকগুলো বেশি বেশি পড়ার চেষ্টা করেছি।

ইংরেজির মতো বাংলায়ও কাছাকাছি টপিকের ক্ষেত্রে অভিন্ন কৌশল অনুসরণ করেছি। যেমন—প্রতিদিন দুজন সাহিত্যিকের রচনা ও গুরুত্বপূর্ণ তথ্য, পড়ার সময় নোট রাখা, প্রশ্ন বিশ্লেষণ করে গুরুত্বপূর্ণ টপিক বাছাই ইত্যাদি।বাংলা ব্যাকরণের জন্য নবম-দশম শ্রেণির মুনীর চৌধুরীর বোর্ড বইটা প্রায় মুখস্থ ছিল। প্রাচীন ও মধ্য যুগের রচনা বা সাহিত্য সপ্তাহের শেষ দিন পড়তাম ও লিখতাম।

গণিতের ওপর দখলকে কাজে লাগিয়ে প্রিলিতে ১৫ এবং লিখিত পরীক্ষায় ৫০ নম্বর নিশ্চিত করার টার্গেট করি। প্রতিটি টপিকের অঙ্ক আগে গতানুগতিক (বিস্তারিত) করতাম, এরপর সেটা শর্টকাট নিয়মে করার চেষ্টা করতাম। যাতে প্রিলি পরীক্ষায় দ্রুত সময়ের মধ্যে উত্তর করা যায়। বই অনুসরণ করেছি সপ্তম থেকে দশম শ্রেণি পর্যন্ত। উচ্চতর গণিত বই থেকে করেছি বিন্যাস ও সমাবেশ অংশটুকু।

প্রিলিতে সবচেয়ে বেশি নম্বর সাধারণ জ্ঞান সম্পর্কিত অংশে অর্থাৎ বাংলাদেশ (২০) ও আন্তর্জাতিক বিষয়াবলিতে (৩০) মোট ৫০ নম্বর। আমি সিলেবাসের টপিক ধরে বিভিন্ন রেফারেন্স বই থেকে পড়তাম। এরপর বাজারের প্রচলিত গাইড বই থেকে বিগত সালে আসা বিসিএসসহ বিভিন্ন চাকরির পরীক্ষার প্রশ্নগুলো সমাধান করতাম। রেফারেন্স বই থেকে বিস্তারিত পড়ার সুবিধা হলো—গাইড বই থেকে যে প্রশ্নই দেখতাম, সেগুলোই পরিচিত মনে হতো। বিভিন্ন ঘটনা সম্পর্কে বিশদ ধারণা ছিল। প্রিলির প্রস্তুতি নিতে গিয়ে লিখিত পরীক্ষার এ অংশের (৩০০ নম্বরের) পড়ার অনেকটাই হয়ে যায়।

আমার কাছে ভূগোল বিষয়টা জটিল মনে হতো। তাই এই অংশে মাত্র ৫ নম্বর টার্গেট রেখেছিলাম। নবম-দশম শ্রেণির ভূগোল বইয়ের পাশাপাশি ফেসবুকের প্রস্তুতি সংশ্লিষ্ট গ্রুপ-পেজ ও অনলাইনের সহায়তা নিয়েছি।নৈতিকতা ও সুশাসনের ক্ষেত্রেও অনলাইন থেকে প্রশ্ন ও তথ্য জোগাড় করেছি। মানসিক দক্ষতার জন্য বিগত বিসিএস পরীক্ষার প্রিলি ও লিখিত পরীক্ষার প্রশ্নগুলো বাসায় বারবার সমাধান করেছি।

বিজ্ঞানের শিক্ষার্থী হওয়ায় সাধারণ বিজ্ঞানের ভৌতবিজ্ঞান অংশে সময় কম দিয়েছি।জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের মাস্টার্সে কম্পিউটার কোর্স থাকায় প্রযুক্তি বিষয়ের প্রস্তুতিতে বেগ পেতে হয়নি।৩৮তম বিসিএসই ছিল আমার জীবনের প্রথম বিসিএস। আর এটাতেই সুপারিশপ্রাপ্ত হয়ে এখন শিক্ষা ক্যাডারে কর্মরত আছি। লেখকঃ এম এম মুজাহিদ উদ্দীন,প্রতিবেদনটি কালের কন্ঠ থেকে নেওয়া।

Leave a Comment