Breaking News
Home / Bank Preparation / তিন বোনের যাত্রাঃ লন্ডন ছাড়িয়ে গেলো তিন বোনের শিল্পকর্ম

তিন বোনের যাত্রাঃ লন্ডন ছাড়িয়ে গেলো তিন বোনের শিল্পকর্ম

ঘরে বসে কিছু করা যায় কি না এ চিন্তা থেকেই শুরু করেন হাতের কাজ। শুরুটা একা করলেও একসময় যোগ দেন তাঁর অন্য দুই বোন—আরিফা ইয়াসমিন ও সাবিনা ইয়াসমিন। সেই থেকে তিন বোনের স্বাবলম্বী হওয়ার যাত্রা। সেই যাত্রার গল্প শোনাচ্ছেন কবীর আলমগীর

একদিন নতুন বছরের ক্যালেন্ডার এলো নিলুফারের বাসায়। ক্যালেন্ডারের পাতায় চকচক করছিল নানা ছবি। চোখ আটকে যায় ক্যালেন্ডারের পাতায় থাকা একটা কাগজের ফুলের দিকে। নিলুফার ইয়াসমিন ক্যালেন্ডারে ঝুলে থাকা দেয়ালের দিকে তাকিয়ে থাকলেন কিছুক্ষণ। ভালো করে ফুলটা দেখলেন। এরপর ভাবলেন, তিনি চাইলেই তো এই ফুল অবিকল বানাতে পারেন! নিলুফার সিদ্ধান্তে এলেন, তিনি রঙিন কাগজের সমারোহে ওই ফুল বানাবেন। আইডিয়াটা শেয়ার করলেন মেজো বোন আরিফা ইয়াসমিনের কাছে। একটু অবাক হলেন আরিফা ইয়াসমিন। বড় বোনের দিকে প্রশ্ন ছুড়ে বললেন, ‘তুমি কি ফুলটি সত্যিই বানাতে পারবে।’ নিলুফার জবাব দিলেন, ‘অবশ্যই।’ ব্যস, লেগে গেলেন কাগজের ফুল বানাতে। বাসায় থাকা পরিত্যক্ত কাগজ কেটেকুটে ঘণ্টা তিনেক সময় দিয়েই বানিয়ে ফেললেন একটি ফুল। এর পর থেকে নিলুফারের স্বপ্নের পথ শুরু।

ঢাকার লালমাটিয়া মহিলা কলেজ থেকে রাষ্ট্রবিজ্ঞানে অনার্স এবং মিরপুর বাঙলা কলেজ থেকে মাস্টার্স পাস করেন নিলুফার ইয়াসমিন। শিক্ষাজীবন শেষে যোগ দেন শিক্ষকতা পেশায়। কিন্তু সংসারজীবনে প্রবেশের পর সংসার-সন্তান সামলাতে ইস্তফা দিতে হয় সে চাকরি থেকে। এর পরও অনেক জায়গা থেকে চাকরির সুযোগ এলেও সংসারের সাতপাঁচ ভেবে আর চাকরি করা হয়ে ওঠেনি। বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে চাকরিজীবী স্বামীর সঙ্গে সংসার নিলুফারের। দুই ছেলে নাভিদ নিশাদ, ছোট ছেলে নুবাইদ নুহানের জননী তিনি। স্বামী কিংবা পরিবারের অজান্তেই গোপনে শুরু করেন কাগজের উপকরণ বানানোর কাজ। কেন এই লুকোচুরি, উত্তরে নিলুফার বলেন, ‘সৃজনশীল কোনো কাজই প্রথমে খেয়ালখুশির বহিঃপ্রকাশ। সমাজের কারো কারো কাছে এটি পাগলামিও বটে। সংসারের ফাঁকে ফাঁকে আমাদের এই কাজগুলোকে কে কিভাবে নেন সেই দ্বিধা থেকেই লুকোচুরি।’

আগে লুকোচুরিতে কাজ করলেও এখন তা প্রকাশ্যে এসেছে। পরিবারের অন্য সদস্যদের প্রেরণায় এগিয়ে যাচ্ছেন প্রতিনিয়ত। নিলুফার শুধু একা নয়। স্বপ্ন দেখা শুরু করলেন নিলুফারের ছোট দুই বোনও। ইডেন কলেজে ইংরেজি বিভাগ থেকে মাস্টার্স পাস করা আরিফা ইয়াসমিন ও মোহাম্মদপুরের মকবুল হোসেন কলেজে বিএপড়ুয়া সাবিনা ইয়াসমিন। কাজ শেখা শুরু করলেন বড় বোনের কাছ থেকে। তিন বছর আগের এ পরিকল্পনার স্মৃতিচারণা করতে গিয়ে নিলুফার ইয়াসমিন বলেন, ‘আমাদের এই সাহসটুকু ছিল বলেই আমরা এগিয়ে যাচ্ছি। আমাদের কোনো প্রশিক্ষণ নেই, কোনো অভিজ্ঞতা নেই। কেবল দেখে দেখে শেখা।’

শুধু হাতের কাজেই থেমে ছিলেন না তিন বোন। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকে তৈরি করেছেন আর্ট প্রজেক্ট নামে একটি পেজও। মূলত ফেসবুকের এই পেজের মাধ্যমে বর্তমানে ব্যবসা চলছে তিন বোনের। প্রতিদিনই কোথাও না কোথাও থেকে কাজের অর্ডার পান তাঁরা। ফেসবুক পেজের মাধ্যমে প্রথম দিনের বিক্রি সম্পর্কে নিলুফার বলেন, ‘গাজীপুরের ইফরাত জুবায়দা নামে একজন ক্রেতা আমার কাছ থেকে চারটি ওয়ালমেট নিয়েছিলেন। সেগুলো এক হাজার ৫০০ টাকায় বিক্রি করেছিলাম। ওয়ালমেট হাতে পাওয়ার পর বিকাশের মাধ্যমে এক হাজার ৫০০ টাকা পরিশোধ করেছিলেন ওই ক্রেতা।’ হাতে তৈরি ওয়ালমেট বিক্রির প্রথম দিনের অভিজ্ঞতা সম্পর্কে তিন উদ্যোক্তার প্রধান নিলুফার ইয়াসমিন বলেন, ‘ওই ক্রেতা ফোন করে বলেছিলেন, কিছুক্ষণের মধ্যেই আপনার অ্যাকাউন্টে এক হাজার ৫০০ টাকা যাবে। এ খবরটি শোনার পর থেকে মোবাইল নিয়ে বসে ছিলাম—কখন খুদে বার্তা আসে। টাকা পেয়েই খুশিতে একটা চিৎকার দিয়ে বলেছিলাম, ‘হ্যাঁ, আমরাই পারব।’

নিলুফারের বোন আরিফা ইয়াসমিন বলেন, ‘কেবল নতুন উপকরণ নয়, আমাদের কাছে পরিত্যক্ত কাগজ কিংবা প্লাস্টিকও মূল্যবান। আমরা বেশির ভাগ হাতের কাজ করি ফেলে দেওয়া জিনিস থেকে। যেমন ধরুন একটা কলমের মুখ, নষ্ট হওয়া কোনো কাগজ—এটা ব্যবহার করে আমরা বানিয়ে ফেলি দর্শনীয় সব জিনিস।’ অপর উদ্যোক্তা সাবিনা ইয়াসমিন বলেন, ‘তিন বোন একসঙ্গে কাজ করতে পেরে আমরা খুশি। পড়াশোনার ফাঁকে ফাঁকে আমরা প্রতিদিন তিন-চার ঘণ্টা সময় ব্যয় করি। মোট কথা উপভোগ করছি, আনন্দও পাচ্ছি আবার উপার্জনও হচ্ছে।’

এই তিন উদ্যোক্তা বানান গয়না, ওয়ালমেট, কলমদানি, ফুলদানি, টিস্যু বক্স, চাবির রিং, ওয়াল হ্যাংগার, ফাইলহোল্ডার, জন্মদিনের বিয়ের কার্ড, ফটো অ্যালবাম, কাগজ-কাপড়ের খেলনা, ফুল-ফল-পাখি প্রভৃতি। একটা কলমদানি বিক্রি করেন ৩৫০ থেকে ৫০০ টাকায়, নিমন্ত্রণ কার্ড ১৫০ থেকে ৩৫০ টাকা, পেইন্টিং বিক্রি করেন ৫০০ থেকে এক হাজার টাকা, ওয়ালমেট বিক্রি করেন এক হাজার থেকে এক হাজার ৫০০ টাকায়।

এ ছাড়া নিলুফার ছবিও আঁকেন। রংতুলি, কখনো বা কাপড়-কাগজের মাধ্যমে ফুটিয়ে তোলেন ছবির অবয়ব। রংতুলিতে আগ্রহের বিষয়ে নিলুফার জানান, আবহমান বাংলার চিরায়ত রূপ তাঁর আগ্রহের বিষয়। গ্রামীণ জীবন ও বাংলাদেশের হারিয়ে যাওয়া ঐতিহ্যের অনুসন্ধানই তাঁর আগ্রহের কেন্দ্রবিন্দু। প্রশিক্ষণ না থাকলেও রংতুলির অভূতপূর্ব সমন্বয় ঘটাতে পারেন। রংতুলির অপূর্ব মিশ্রণ কিভাবে সম্ভব, উত্তরে নিলুফার বলেন, ‘কোনো কিছু চিন্তা না করেই ব্লক-বাটিকের কাজ শিখেছিলাম। মিরপুর থেকে ১৫ দিনের একটা ট্রেনিং নিয়েছিলাম। ওখানেই শিখেছিলাম কিভাবে একটা রঙের সঙ্গে আরেকটা রঙের মিশেল ঘটাতে হয়।’ হাতের কাজ বিক্রি করে যা উপার্জন, তাতে অংশীদার তিন বোন খুশি। বাড়তি সময় কাজে লাগিয়ে গড়ে তাঁরা উপার্জন করেন ১৫ থেকে ২০ হাজার টাকা। শুধু প্রতিদিন তিন ঘণ্টার এই উপার্জনে তাঁরা প্রগাঢ় আত্মবিশ্বাসী। ব্যবসাকে আরো বড় করতে চান তাঁরা। কিন্তু সমস্যা হলো, পুঁজি নেই। অন্তত লাখ তিনেক টাকা হলে তাঁরা স্বপ্ন পূরণের পথে আরো দৃঢ় পায়ে এগোতে পারবেন।

এরই মধ্যে একটা আশার খবরও আছে তিন বোনের জন্য। লন্ডনে শাহিদা চৌধুরী নামে এক ব্যবসায়ী যোগাযোগ করেছেন নিলুফার ইয়াসমিনের সঙ্গে। ওই ব্যবসায়ী জানিয়েছেন, লন্ডনে হাতের কাজের দারুণ চাহিদা রয়েছে। তিনি নিলুফারের কাছ থেকে পণ্যগুলো কিনে লন্ডনে তাঁর শোরুমে রাখতে চান। নিলুফার জানান, ‘দেশের সীমানা ছাড়িয়ে আমাদের পরিশ্রমের পণ্যগুলো লন্ডনে যাবে, ভাবতেই অন্য রকম ভালো লাগা কাজ করে। আমরা এরই মধ্যে লন্ডনে স্যাম্পল পাঠানোর প্রক্রিয়া শুরু করেছি।’ ছোট আরো একটা স্বপ্ন রয়েছে তিন বোনের। তিন বছর ধরে করা কাজগুলো নিয়ে একটা এক্সিবিশন করতে চান তাঁরা। কোনো স্পন্সর পেলে এই এক্সিবিশনের কাজটি সহজ হবে তাঁদের জন্য। নিলুফার ইয়াসমিন বলেন, ‘অনেক দিনের স্বপ্ন একটি এক্সিবিশন দেওয়া। আমরা যে কাজগুলো করি তা মানুষ দেখুক, মানুষ জানুক। শুধু নিভৃতে-নীরবে কাজ করা নয়, আমরা মানুষকে জানানোর জন্যই কাজ করে যাচ্ছি। একই সঙ্গে বলব, যাঁরা বেকার বসে আছেন, চাকরি খুঁজছেন, চাইলে আমাদের মতো অথবা নিজেদের পছন্দমতো কোনো হাতের কাজে নেমে পড়তে পারেন। অপরের দাসত্ব না করে নিজেই স্বাধীন পেশা গড়ে তুলতে পারেন। হয়ে উঠতে পারেন আত্মনির্ভরশীল।’

About pressroom

Check Also

৩৮তম বিসিএসে পররাষ্ট্র ক্যাডার হলেন জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের আল-আমিন!

চট্টগ্রাম কলেজের ছাত্র ছিলেন মো. আল আমিন সরকার। জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনে পড়াশোনা করলেও তিনি তার …

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Powered by keepvid themefull earn money