বাংলাদেশের তরুণদের আছে বিপুল সম্ভাবনা: হাসান মাহবুব

প্রযুক্তি জগতের আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বাংলাদেশের গর্ব মো. হাসান মাহবুব। বর্তমানে সিবিআরই, আইবিএম জাপানে টেকনিক্যাল ডিরেক্টর হিসেবে কর্মরত এ প্রকৌশলী ১৭ বছরের ক্যারিয়ারে যুক্ত হয়েছেন অ্যামাজন, ইন্টেলস্যাট, এয়ারট্রাঙ্ক, গ্রামীণফোনসহ একাধিক গ্লোব্যাল জায়ান্টের সঙ্গে। তার দীর্ঘ পথচলার গল্প, ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা এবং দেশের জন্য স্বপ্ন নিয়ে কথা বলেছেন জাগো নিউজের সঙ্গে। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন মশিউর শাফী—

জাগো নিউজ: বর্তমানে সিবিআরই, আইবিএম জাপানে গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বে আছেন। কাজের ক্ষেত্রটি কেমন?
হাসান মাহবুব: আমি বর্তমানে সেখানে টেকনিক্যাল ডিরেক্টর অব ইঞ্জিনিয়ারিং পদে কাজ করছি। আমার কাজ মূলত জটিল ইঞ্জিনিয়ারিং সিস্টেম ডিজাইন, ডাটা সেন্টার ইনফ্রাস্ট্রাকচার এবং ক্লাউড-ভিত্তিক পাওয়ার ম্যানেজমেন্ট নিয়ে। এটি এমন একটি দায়িত্ব; যেখানে প্রতিদিন নতুন প্রযুক্তিগত চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করতে হয় এবং বড় স্কেলে সিদ্ধান্ত নিতে হয়।

জাগো নিউজ: এর আগে অ্যামাজন, ইন্টেলস্যাট, এয়ারট্রাঙ্কের মতো প্রতিষ্ঠানে কাজ করেছেন। কোন অভিজ্ঞতাটি সবচেয়ে স্মরণীয়?
হাসান মাহবুব: প্রতিটি প্রতিষ্ঠানের অভিজ্ঞতা আলাদা এবং সমৃদ্ধ ছিল। তবে অ্যামাজন ওয়েব সার্ভিসেসে কাজ করার সময় আমি জাপান অঞ্চলের মিশন-ক্রিটিক্যাল ইলেকট্রিক্যাল সিস্টেম পরিচালনার দায়িত্বে ছিলাম। যা অনেক বড় একটি পরিসরে পরিচালিত হতো। ইন্টেলস্যাটে থাকাকালে নাসার সঙ্গে কাজ করার সুযোগ হয়েছিল, যা আমার জন্য অনেক গর্বের এবং প্রযুক্তির গভীর স্তরে পৌঁছার একটি সুযোগ ছিল।

জাগো নিউজ: বাংলাদেশের বগুড়া থেকে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে পৌঁছাতে পথটা কেমন ছিল?
হাসান মাহবুব: আমি বগুড়ার সন্তান। ছোটবেলা থেকেই প্রযুক্তির প্রতি আগ্রহ ছিল। বিদ্যুৎ, ইলেকট্রনিক্স—এসব নিয়ে নাড়াচাড়া করতাম। ঢাকায় পড়াশোনার পর আন্তর্জাতিক পর্যায়ে আসতে অনেক পরিশ্রম, আত্মত্যাগ এবং ধৈর্য প্রয়োজন হয়েছে। ভাষা, সংস্কৃতি, সময়—সবই ছিল চ্যালেঞ্জ, তবে কখনো হাল ছাড়িনি।

জাগো নিউজ: বাংলাদেশের প্রতি আপনার সংযুক্তি এখনো বেশ দৃঢ়। দেশে ফিরে কি কাজ করার পরিকল্পনা করছেন?
হাসান মাহবুব: অবশ্যই। আমি মনে করি, আমাদের বৈশ্বিক অভিজ্ঞতা দেশকে ফিরিয়ে দিতে হবে। তাই প্রযুক্তি, শক্তি খাত এবং স্মার্ট গভর্নেন্স—তিনটি ক্ষেত্রে আমি ভবিষ্যতে বাংলাদেশে আরও সক্রিয় ভূমিকা রাখতে চাই। এরই মধ্যে কয়েকটি থিংক ট্যাংক ও কমিউনিটি প্রজেক্টে যুক্ত হয়েছি।

জাগো নিউজ: আপনি জিয়া সাইবার ফোর্সের আইটি অ্যাডভাইজার হিসেবে যুক্ত আছেন। এর ভূমিকা কেমন?
হাসান মাহবুব: জিয়া সাইবার ফোর্স মূলত তথ্যভিত্তিক সচেতনতা, ডিজিটাল অ্যাক্টিভিজম এবং রাজনৈতিক বিশ্লেষণে কাজ করে। আমি এখানে প্রযুক্তিগত পরামর্শ দিই এবং চেষ্টা করি প্রযুক্তিকে একটি ইতিবাচক শক্তি হিসেবে কাজে লাগাতে। দেশের গণতান্ত্রিক অভিযাত্রায় ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মের গুরুত্ব দিন দিন বাড়ছে।

জাগো নিউজ: ৩৩তম বিসিএসে উত্তীর্ণ হয়েছিলেন কিন্তু শেষ পর্যন্ত ক্যাডার হননি। এ বিষয়ে কিছু বলবেন?
হাসান মাহবুব: আমি ৩৩তম বিসিএসে প্রিলিমিনারি, লিখিত ও মৌখিক পরীক্ষায় সফল হই। কিন্তু ক্যাডার না হওয়াটা তখন হতাশাজনক ছিল। তবে এখন বুঝি, জীবনে কোনো অভিজ্ঞতাই বৃথা যায় না। ওই প্রস্তুতি ও অভিজ্ঞতা আমাকে জাতীয় ভাবনায় আরও সচেতন করেছে।

জাগো নিউজ: আপনার পরিবারেও তো দেশসেবার চেতনা রয়েছে।
হাসান মাহবুব: একদম ঠিক বলেছেন। আমার মা সুপ্রিম কোর্টের একজন সিনিয়র আইনজীবী এবং রাজনীতিবিদ। আমার দাদা এবং নানাও সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী ছিলেন। পাশাপাশি তারাও ছিলেন প্রখ্যাত রাজনীতিবিদ। আমার স্ত্রী একজন চিকিৎসক ও বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর লেফটেন্যান্ট কর্নেল। পারিবারিকভাবে দেশপ্রেমের শিক্ষা পেয়েছি, যা আমাকে সব সময় অনুপ্রাণিত করে।

জাগো নিউজ: দেশের বাইরে থেকে জুলাই গণঅভ্যুত্থানে কীভাবে ভূমিকা রেখেছিলেন?
হাসান মাহবুব: আমি সে সময় জাপানের প্রবাসীদের সংগঠিত করেছিলাম। দেশে নির্যাতন, গুলিবর্ষণের ভিডিও আমরা ইংরেজি সাবটাইটেলে তৈরি করলাম। জাপানি বন্ধুদের দিয়ে মিডিয়ায় ছড়িয়ে দিলাম। টোকিওর রাস্তায় আমরাই মানববন্ধন করলাম—বুকে পোস্টার, ‘Stop Police Brutality in Bangladesh’। লিখলাম ব্লগে, জাপানি পত্রিকায়। আমরা টোকিও, নিউইয়র্ক, লন্ডন, ক্যালগেরি, বার্লিন, দুবাই—প্রবাসের শহরগুলোকে একেকটি প্রতিবাদের মঞ্চ বানিয়ে ফেলি। আন্দোলনের মধ্যে যারা আহত হচ্ছিল, তাদের চিকিৎসার ব্যবস্থা করতে ডাক্তার আত্মীয়দের যুক্ত করলাম। কারো বিকাশ নম্বরে টাকা পাঠালাম, কারো হাসপাতালে ভর্তি করাতে সাহায্য করলাম। কারো নাম জানি না, কারো চেহারা দেখিনি—তবু তাদের পাশে দাঁড়াতে দ্বিধা করিনি। কারণ তারা আমার ভাই-বোন, আমার বাংলাদেশের সন্তান।

জাগো নিউজ: তরুণদের জন্য কী বার্তা দিতে চান?
হাসান মাহবুব: প্রথমত, আপনাকে নিজের ওপর বিশ্বাস রাখতে হবে। প্রযুক্তির দুনিয়ায় বাংলাদেশিদের জন্য অপার সম্ভাবনা আছে। শুধু প্রয়োজন আন্তর্জাতিক মানে নিজেদের তৈরি করা। ভাষাজ্ঞান, সফট স্কিল এবং বাস্তব জ্ঞানে নিজেকে দক্ষ করে গড়তে হবে। অবশ্যই নিজের দেশ ও সমাজের প্রতি দায়বদ্ধ থাকতে হবে।

জাগো নিউজ: ভবিষ্যতের স্বপ্ন কী?
হাসান মাহবুব: আমি চাই বাংলাদেশ একদিন প্রযুক্তি, শক্তি এবং দক্ষ মানবসম্পদের দিক থেকে আত্মনির্ভর হয়ে উঠুক। সেই অভিযাত্রায় আমি সর্বোচ্চ অবদান রাখতে চাই—নিষ্ঠার সঙ্গে।