বাংলা ব্লগারে আপনাকে স্বাগতম, সবার আগে সঠিক তথ্য পেতে আমাদের সাথে থাকুন সব সময়। আমাদের বেশির ভাব তথ্য বিশ্লেষন করে তারপর উপস্থাপন করা হয়। শতভাগ তথ্য অনলাইন থেকে সংগ্রহ করে বিশ্লেষনের মাধ্যমে তুলে ধরা হয়। আপনি চাইলে যে কোন তথ্য আমাদের কাছেও পাঠাতে পারেন।
তো চলুন আজকের বিষয়’টি নিয়ে পড়ে নেওয়া যাক….

সিদ্ধান্ত অনুযায়ী আইইআর এ ভর্তি পরীক্ষা দিলেন। ভর্তির সুযোগও পেলেন। শুরু হলো নতুন জীবনের লড়াই। চার বছরের অনার্স পরীক্ষায় ভাষা শিক্ষা বিভাগে প্রথম শ্রেণিতে প্রথম হলেন তিনি। মাস্টার্সেও একই ফল। বাবা-মায়ের স্বপ্ন পূরণে এগিয়ে গেলেন আরও একধাপ। পারতেন বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক হতে। কিন্তু না তিনি শুরু করলেন বিসিএসের প্রস্তুতি। ৩৩তম বিসিএস পরীক্ষা দিলেন। ক্যাডার পেলেন না। নন ক্যাডার এ নিয়োগের সুপারিশ পেলেন। কিন্তু তিনি দমে যাননি। শুরু করলেন ৩৪তম বিসিএসের জন্য নতুন প্রস্তুতি।

২০০৭ সালের কথা। উচ্চ মাধ্যমিক পাসের পর মেয়েটি বাংলাদেশ নৌ বাহিনীর কমিশনড অফিসার পদে পরীক্ষায় প্রথম হয়েছিলেন। চাকরিতে যোগ দিয়ে সপ্তাহখানেক পর মায়ের বিরোধিতার মুখে অনেকেরই স্বপ্নের ওই চাকরি ছেড়ে দেন তিনি। মায়ের স্বপ্ন ছিল মেয়ে প্রশাসন ক্যাডারে বড় কর্মকর্তা হবেন। কিন্তু সেই স্বপ্ন পূরণে তো তাকে বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হতে হবে।

সময়ের মারপ্যাঁচে তিনি বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির জন্য প্রস্তুতি নিতে পারেননি। পুরো সময়ই চলে গেছে নৌ বাহিনীর জন্য। পরে প্রস্তুতি ছাড়াই ভর্তি পরীক্ষা দিলেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ক ইউনিটে। সুযোগ পেলেন প্রাণিবিদ্যা বিভাগে। নৌ বাহিনীতে যোগ দান নিয়ে ব্যস্ত থাকায় প্রাণিবিদ্যা বিভাগে ভর্তির সময় চলে গেল। এখন অন্য ইউনিটে ভর্তি পরীক্ষা দেওয়ার সময়ও নেই। তার সামনে দুটি বিকল্প, একটি একই বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা ও গবেষণা ইনস্টিটিউট অথবা বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনা। প্রথম বিকল্পটাই বেছে নিলেন ৩৪তম বিসিএসে প্রশাসন ক্যাডারে প্রথম হওয়া মুনিয়া চৌধুরী। কারণ, তার চূড়ান্ত লক্ষ্য তো বিসিএস পরীক্ষা দেওয়া। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়লেই সেই লক্ষ্য অর্জন সহজ হবে বলে ধারণা তার।

সকাল ১০টায় বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় পাঠাগারে পড়তে যেতেন। বের হতেন রাত ৮টায়। এভাবে চলতে থাকে ছয় মাস। এরপর ৩৪তম বিসিএসে অংশ নেন। পরীক্ষা দিয়ে বাবা-মাকে বলেছেন অনেক ভালো ফল হবে। কারণ তার প্রস্তুতি ছিল অনেক ভালো। আর পরীক্ষার খাতায় যে কোনো প্রশ্নের উত্তর তিনি সাজাতেন খুবই সুন্দর করে। গুরুত্বপূর্ণ কোনো ইস্যু অন্য কালি দিয়ে লিখতেন, যাতে পরীক্ষকের চোখে পড়ে। রাজধানীর ইস্কাটন গার্ডেনে বাবার সরকারি কোয়ার্টারে কথা হয় মুনিয়ার সঙ্গে। তার বাবা সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয়ের সচিব ড. চৌধুরী মো. বাবুল হাসান। ঢাকাটাইমসকে বলেছেন তার সেই চেষ্টা আর সাফল্যের কথা।

বিসিএসে সাফল্যের জন্য কোন বিষয়ে বেশি গুরুত্ব দিতে হবে?

মুনিয়া বললেন, বিসিএসে ভালো করতে হলে সব বিষয়েই ভালো জানতে হবে। কোনো একটা বিষয়ে ভালো জানলে হবে না। বাংলা, ইংরেজি, অঙ্ক, বিজ্ঞান ও সাধারণ জ্ঞান সব বিষয়েই সমানভাবে ভালো জানতে হবে। অন্যথায় ভালো ফল করা যাবে না।

আগামীতে যারা বিসিএস দিচ্ছেন তাদের জন্য কী পরামর্শ থাকবে?

একেকজনের ক্ষেত্রে একেক কৌশল কাজ করে। আমি যেভাবে পড়েছি, সেভাবে হয়ত অন্যদের ক্ষেত্রে কাজ করবে না। আমি একই সঙ্গে পড়েছি, পাশাপাশি লিখেছি। না লিখলে আমার মনে থাকে না। কারও কারও ক্ষেত্রে হয়ত পড়লেই চলে। তাই একজন কীভাবে পড়বেন সেটা তাকেই ঠিক করতে হবে।

বাংলা, ইংরেজি, বিজ্ঞান, গণিত বিষয়ে এসএসসি ও এইচএসসির পাঠ্যবইগুলো ভালোভাবে পড়লে উপকার হবে। সেই সঙ্গে তথ্যপ্রযুক্তির সুবিধা নিতে হবে। আধুনিক জ্ঞান-বিজ্ঞানের অনেক কিছুই এখন সহজলভ্য ইন্টারনেটের বদৌলতে। পাশাপাশি পড়তে হবে বাংলাদেশের সংবিধান, ধারণা রাখতে হবে ইতিহাস, রাষ্ট্র পরিচালনা, দেশের এবং বিশ্বের সাম্প্রতিক ঘটনাপ্রবাহ নিয়ে।

আবার কিছু বিষয় মুখস্থ রাখলেও পরীক্ষার খাতায় লেখার ক্ষেত্রে কৌশলী হতে হবে। উপস্থাপনা যেন সবার মতো না হয় সেদিকে লক্ষ্য রাখতে হবে। বাস্তব জীবনের উদাহরণের আলোকে লেখা এগিয়ে নিলে পরীক্ষকের মনোযোগ আকর্ষণ করা সহজ হবে। সেই সঙ্গে লেখার মান হতে হবে ঝরঝরে। সাহিত্য চর্চা করলে ভাষার দিক থেকে সমৃদ্ধ হওয়া যাবে। বিশেষ করে আমাদের শিক্ষার্থীদের মধ্যে ইংরেজি বিষয়ে চর্চার অভাব আছে, ভাষাগত দুর্বলতা রয়ে গেছে। ইংরেজি সাহিত্য পড়লে এই সমস্যা দূর করা যাবে। আবার পরীক্ষার হলে প্রশ্নপত্র পাওয়া মাত্রই লেখা শুরু না করে এক মিনিট বা দুই মিনিট চিন্তা করুন, ভাবুন, কীভাবে শুরু করবেন। শুরুটা ভালো হলে পরের লেখাগুলো এমনিতেই আসে।

আরও একটা বিষয় ভালো কাজে দিতে পারে। সেটা হচ্ছে, কোথাও কোনো গুরুত্বপূর্ণ ইস্যু বা তথ্য পেলে ডায়েরিতে লিখে রাখা। আমাদের মাথা কম্পিউটার নয় যে, সব কিছু মনে রাখতে পারে। ডায়েরিতে প্রতিনিয়ত লিখে রাখলে এবং সেগুলোতে চোখ বুলালে নিজের তথ্যভাণ্ডার সমৃদ্ধ হবে।

প্রথমবার সাফল্য পাননি…

এমনটি যে কারও ক্ষেত্রে হতেই পারে। অনেকে এ জন্য দমে গিয়ে নিজেকে গুটিয়ে নেন। কিন্তু এটা হলে চলবে না। বিসিএসের জন্য প্যাশন থাকতে হবে। নিজেকে উদ্বুদ্ধকরণ আর জেদটা জরুরি। একবার না হলে পরের বার বা তারও পরের বার হবে। এজন্য চেষ্টা চালিয়ে যেতে হবে। সর্বোপরি লক্ষ্যটা সুনির্দিষ্ট থাকলেই ভালো হবে।

চাকরি জীবনে নিজেকে কোথায় দেখতে চান?

আমার এমন সুনির্দিষ্ট স্বপ্ন নেই যে, আমাকে এটা বা ওটা হতে হবে। তবে নিজেকে দক্ষ আমলা হিসেবে গড়ে তুলতে চাই। এ জন্য মাঠ পর্যায়ে কাজের ক্ষেত্রে মনোযোগী হব, পড়ালেখাটাও চালিয়ে যাব।

বাবার মতোই সচিব হতে চাইবেন…

বাবাকে আমি আদর্শ মনে করি। তিনি নির্লোভ থেকে সাদামাটা জীবনযাপন করে গেছেন। সেই আদর্শই আমি লালন করি। তার মতোই সৎ কর্মকর্তা হিসেবে কাজ করতে চাই। ছোটবেলা থেকেই অল্প পেয়ে মানুষ হয়েছি। সম্পদের প্রতি লালসা আমার বাবা শেখায়নি। পড়াশোনা করতে চেয়েছি, মানুষ হতে চেয়েছি। জীবনের শেষ বেলায় গর্ব করে বলে যেতে চাই, কাজ করেছি সাধারণ মানুষের জন্য।

চাকরির পরীক্ষায় এত ভালো ফল করলেন, কী পুরস্কার পেলেন?

আবদার তো বাবা-মায়ের কাছেই থাকে। একটা মোবাইল ফোন পছন্দ হয়েছিল, কিন্তু বাবাকে বলতে সংকোচ হচ্ছিল। পরে চাচাকে বললাম, তিনিই বাবাকে বললেন আর বাবা হাসিমুখে ফোনটি উপহার দিলেন। কী যে ভালো লাগছিল!

পড়াশোনার পাশাপাশি ইদানীং চাকরিতেও এগিয়ে আসছেন মেয়েরা। বিসিএসের মাধ্যমে নিয়োগের একটি বড় অংশও নারী। এই দীর্ঘপথ পাড়ি দিতে নারী হিসেবে আলাদা কোনো সমস্যার মুখোমুখি হয়েছেন?

আমাদের সমাজে নারীদের প্রতি মানুষের সাধারণ দৃষ্টিভঙ্গির এখনো আশানুরূপ পরিবর্তন হয়নি। এখনো অনেকে মনে করে নারী পারবে না। কিন্তু সেদিক থেকে আমি সুবিধা পেয়েছি। পরিবারের পক্ষ থেকে যথেষ্ট সহযোগিতা পেয়েছি। যার কারণে আজ আমি এ পর্যায়ে এসেছি। পরিবার যদি পাশে না দাঁড়াত তা হলে সম্ভব ছিল না। কিন্তু অনেক পরিবারেই সুযোগ থাকে না। পরিবেশ পরিস্থিতির কারণে অনেক সম্ভাবনাময়ী নারী তার যোগ্যতা থেকে বঞ্চিত। এজন্য নারীকেই সচেতন হতে হবে। কেউ তাকে ওপরে ওঠাবে না। তাকেই তার রাস্তা বেছে নিতে হবে।

বাবা-মায়ের ভূমিকাটা কেমন ছিল?

নারীর উন্নয়নে নারীদের ভূমিকাই বেশি রাখতে হবে উল্লেখ করে মুনিয়া বলেন, আমাদের এক ভাই, তিন বোনের লেখাপড়ায় মায়ের অবদান অপরিসীম। কারণ, বাবা সরকারি চাকরিজীবী। তিনি বেশিরভাগ সময়ই বাইরে থাকেন। আমাদের তাই চোখে চোখে রেখেছেন মা। পড়ালেখা, জীবনের চ্যালেঞ্জগুলো বুঝিয়ে দেওয়া, মূল্যবোধ শেখাÑসবই মায়ের হাত ধরেই। বলতে গেলে মায়ের চেষ্টাতেই আমরা আজ এই পর্যায়ে পৌঁছেছি। আবার বাবার ভূমিকাটা ছিল কোচের মতো। তিনি বরাবর উৎসাহ দিয়েছেন, পড়ানোর ক্ষেত্রে তার দিকনির্দেশনা অনেক বেশি কাজে দিয়েছে। এসএসসিতে আমি চেয়েছিলাম মানবিকে ভর্তি হব। কিন্তু বাবা বুঝিয়েছেন বিজ্ঞানে পড়লে পরের জীবনের জন্য ভালো হবে। এখন বুঝি, বাবা সেদিন এই কথা না বললে আজ আমি এই পর্যায়ে নাও আসতে পারতাম।

মেয়েদের জন্য শ্বশুরবাড়িও গুরুত্বপূর্ণ। বিয়ের পর পুত্রবধূর বাবা-মায়ের ভূমিকাও নিতে হয় শ্বশুর-শাশুড়িকে। অনেক ক্ষেত্রেই দেখা যায়, বিয়ের পর পুত্রবধূর পড়াশোনা, চাকরির ক্ষেত্রে উৎসাহ দেওয়ার বদলে বাধা দেওয়া হয়। কিন্তু তাদেরও বুঝতে হবে, তাদের মেয়েও অন্যের বাড়িতে গিয়ে একই সমস্যায় পড়তে পারে। তাই সবাইকে নিজের মেয়ের ভবিষ্যতের কথা ভেবে হলেও পুত্রবধূকে তার বিকাশের সুযোগ করে দিতে হবে। আমাকে আমার শ্বশুর বাড়ির পক্ষ থেকে যথেষ্ট সহযোগিতা করা হয়েছে। বিশেষ করে আমার স্বামীর কথা না বললেই নয়। আমার স্বামী ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সহকারী অধ্যাপক আশরাফ সাদেকের সহযোগিতার কোনো কমতি ছিল না। তার উৎসাহ আমার স্বপ্ন পূরণে অতিরিক্ত মাত্রা যোগ করেছে।

নারীদের কোথায় দেখতে চান?

এটা স্পষ্ট যে, বাংলাদেশে নারীদের ভবিষ্যৎ উজ্জ্বল। নিজের যোগ্যতায় তারা প্রতিষ্ঠিত হতে পারেন, সমাজ পাল্টে দিতে পারেন, এটা এরই মধ্যে প্রমাণ করেছেন আমাদের অগ্রজরা। আমরাও সে পথেই চলছি। নিজেদের আরও সমৃদ্ধ করে আমাদের অনুজদেরও চ্যালেঞ্জ নিতে উদ্বুদ্ধ করতে চাই। আমাদের হাত ধরেই এই সমাজের অপব্যবস্থাগুলোর অবসান ঘটাতে চাই। নারী-পুরুষের সম্মিলিত উদ্যোগে পাল্টে দিতে চাই এই রাষ্ট্রকেই। আরও জনবান্ধব, আরও নারীবান্ধব প্রশাসন গড়তে কাজ করার ইচ্ছা আছে।

মায়ের গল্প

কথা হলো মুনিয়া চৌধুরীর মা শাহিনা চৌধুরীর সঙ্গে। তিনি একজন গৃহিণী। কিন্তু নিজের সন্তানেরা বাইরে কাজ করুক সেটা চেয়েছেন মনেপ্রাণে। ছেলেমেয়েদের সেভাবেই তৈরি করেছেন।

ঢাকাটাইমসকে শাহিনা চৌধুরী জানান, আমার সন্তানদের মধ্যে সবচেয়ে ছোট মুনিয়া। ছোটবেলা থেকেই পড়াশোনার প্রতি ঝোঁক ছিল তার। উচ্চ মাধ্যমিকের পর নৌ বাহিনীতে নিয়োগ পরীক্ষায় প্রথম হওয়ার পরও তাকে আমি সেখান থেকে নিয়ে আসি। তার বাবা চেয়েছিল সে ওই চাকরিই করুক। কিন্তু আমি জানতাম মুনিয়ার ভবিষ্যৎ কোথায় ভালো হবে। সে ফিরে এসে বিরুদ্ধ পরিবেশেও পড়াশোনা করেছে। এর ফল পেয়েছে। শাহিনা চৌধুরী বলেন, ‘মুনিয়ার যখন জন্ম হয়, তখন তার বাবা ছিলেন ম্যাজিস্ট্রেট। সেই থেকে আমার স্বপ্ন, মেয়েটিও এই পথেই আসবে। সেই স্বপ্ন আমার পূরণ হয়েছে। আমি এখন এক তৃপ্ত মা।’

মুনিয়া ছাড়াও শাহিনা চৌধুরীর আরও তিনটি সন্তান আছে। বড় মেয়ে থাকে কানাডায়। মেঝো মেয়ে থাকত অস্ট্রেলিয়ায়, এখন দেশেই থাকছে। আর একমাত্র ছেলে গ্রামীণফোনের কর্মকর্তা।

News Reporter

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *