মো. ফারুক হোসেন ৪৪তম বিসিএসে শিক্ষা ক্যাডারে (পদার্থবিজ্ঞান) সুপারিশপ্রাপ্ত হয়েছেন। তিনি কুড়িগ্রামের রাজারহাট উপজেলার সন্তান। তিনি সরকার বাড়ি উচ্চ বিদ্যালয় থেকে এসএসসি এবং রংপুরের কাউনিয়া কলেজ থেকে এইচএসসি পাস করেন। এরপর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের পদার্থবিজ্ঞান বিভাগ থেকে স্নাতক এবং স্নাতকোত্তর সম্পন্ন করেন।
সম্প্রতি ৪৪তম বিসিএসে সুপারিশপ্রাপ্ত হওয়ার গল্প ও নতুনদের পরামর্শ নিয়ে বিস্তারিত কথা বলেছেন জাগো নিউজের সঙ্গে। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন আনিসুল ইসলাম নাঈম—
জাগো নিউজ: আপনার শৈশব ও বেড়ে ওঠা সম্পর্কে বলুন—
মো. ফারুক হোসেন: কুড়িগ্রামের রাজারহাট উপজেলার গতিয়াশাম গ্রামে আমার জন্ম। বাবা কৃষক এবং মা গৃহিণী। নিম্নবিত্ত পরিবারে তিস্তা নদীর অববাহিকায় আমার বেড়ে ওঠা। কৃষক পরিবারের সন্তান হওয়ায় গ্রামের শতভাগ বাস্তবিক জিনিসের সঙ্গে পরিচয় এবং অভিজ্ঞতা আছে। শৈশবে গ্রামের দুরন্তপনায় কোনো কমতি ছিল না।
জাগো নিউজ: আপনার পড়াশোনা সম্পর্কে বলুন—
মো. ফারুক হোসেন: গ্রামে বেড়ে ওঠার শত চ্যালেঞ্জের মাঝেও প্রথম থেকে ৯ম শ্রেণিতে ক্লাস টপার ছিলাম। ২০১১ সালে সরকার বাড়ি উচ্চ বিদ্যালয় থেকে এসএসসিতে এ প্লাস পাই। এরপর রংপুরের কাউনিয়া কলেজে ভর্তি হই। একই বছর আমার কাজিন শাহ আলম ভাই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে চান্স পান। তখন থেকেই আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে স্বপ্ন দেখতে শুরু করি—আমিও একদিন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র হবো। ২০১৩ সালে এইচএসসি পাস করি। বড় ভাইয়ের দেখানো পথে হেটে ২০১৪-১৫ সেশনে পদার্থবিজ্ঞান বিভাগে ভর্তির সুযোগ পাই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে। তার আগে অবশ্য মাওলানা ভাসানী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হয়েছিলাম। স্কুল এবং কলেজে পাশে পেয়েছিলাম কিছু মেধাবী বন্ধু, যাদের মধ্যে শাহ আলম অন্যতম।
জাগো নিউজ: বিসিএসের স্বপ্ন দেখেছিলেন কখন থেকে?
মো. ফারুক হোসেন: বিশ্ববিদ্যালয়ের শুরু থেকেই বিসিএস দেওয়ার ইচ্ছা জাগে। বলতে গেলে, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির সময় থেকেই মনের কোণে বাসনা ছিল ক্যাডার হওয়ার। কিন্তু পদার্থবিজ্ঞান বিভাগে একাডেমিক পড়াশোনার পাশাপাশি বিসিএস প্রস্তুতি নেওয়া কঠিন। অনার্স শেষ করে ভালোমতো প্রিপারেশন নেওয়া শুরু করি।
জাগো নিউজ: বিসিএস যাত্রার গল্প শুনতে চাই, প্রস্তুতি কীভাবে নিয়েছেন?
মো. ফারুক হোসেন: বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির পর থেকেই বিসিএস দেওয়ার ইচ্ছা জাগে। পদার্থবিজ্ঞান বিভাগে পড়াশোনার পাশাপাশি বিসিএস প্রস্তুতি নেওয়া শুধু কঠিনই নয় বরং অসম্ভও বটে। নিজের কিছু সীমাবদ্ধতা এবং করোনার কারণে স্নাতক রেজাল্ট দিয়ে প্রথম আবেদনের সুযোগ পাই ৪৪তম বিসিএসে। ২০২২ সালের ২২ মে প্রিলির রেজাল্টে নিজের রোল দেখতে পাই। তখন ঈদুল আজহার ছুটি কাটাতে গ্রামের বাসায় এসেছিলাম। ২০২২ সালের অক্টোবরে লিখিত পরীক্ষার দিন ঠিক হয়। তখন ঈদ বিসর্জন দিয়ে লিখিত পরীক্ষার প্রস্তুতি নিতে ঢাকা চলে যাই। জীবনে ওই একটা ঈদই পরিবার ছাড়া করেছিলাম। তখন একসঙ্গে ৪ জন শহিদুল্লাহ হলে ছিলাম। ৪৪তম বিসিএস থেকে ৪ জনই বিভিন্ন ক্যাডারে সুপারিশপ্রাপ্ত হয়েছি।
আমার প্রিলিমিনারি, লিখিত—উভয় ক্ষেত্রেই টিউশন করার মাধ্যমে বিষয়গুলোর সাথে পরিচিত থাকাটা টার্নিং পয়েন্ট ছিল। পাশাপাশি পত্রিকা বা সংবাদমাধ্যমের সাথেও কানেক্টিভিটি ছিল। যার কারণে বাংলাদেশ এবং ইন্টারন্যাশনাল অংশ সহজ লাগতো। জনশ্রুতি আছে, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অল ইন ওয়ান। সত্যিই তাই! সব ধরনের মুভমেন্ট এখান থেকে সহজ। আমার ক্ষেত্রেও তাই হয়েছে। হলে বন্ধু, সিনিয়র, জুনিয়রদের প্রস্তুতি এবং সাফল্য দেখে আরও অনুপ্রেরণা পেতাম যে, পড়লেই পারবো। সকাল থেকে রাত ১২টা অবধি রিডিং রুমেই থেকেছি। টিউশনে যাওয়ার দরকার হলে রিডিং রুম থেকেই যেতাম। এজন্য সাইকেল রিডিং রুমের বারান্দায় রাখা ছিল। কারণ রুমে গেলেই অলসতা কাজ করবে। আমি ৪৪তম বিসিএসের প্রস্তুতি নিতে হাতে পাওয়া সময়টুকুর সঠিক ব্যবহার করার চেষ্টা করেছি।
জাগো নিউজ: ৪৪তম বিসিএসে শিক্ষা ক্যাডার পেয়েছেন, অনুভূতি কেমন?
মো. ফারুক হোসেন: ৪৪তম বিসিএসের যখন রেজাল্ট দেয়; তখন আমি ঘুমিয়ে ছিলাম। সারাদিন ব্যাংকিং শেষে ক্লান্ত ছিলাম অনেক। ছোট ভাই রেজাল্ট দেখে আমাকে ফোন দেয়, ছোট ভাইয়ের ফোন পেয়ে ঘুম ভাঙে। শুনতে পাই বহুল আকাঙ্ক্ষিত শব্দ ‘ভাই, শিক্ষা ক্যাডারে রোল আছে।’ এ যেন স্বপ্নপূরণের ক্ষণ। এ অনুভূতি ভাষায় প্রকাশ করার মতো নয়।
জাগো নিউজ: আড়াল থেকে কেউ অনুপ্রেরণা জুগিয়েছেন?
মো. ফারুক হোসেন: গ্রাম থেকে আমিই প্রথম বিসিএস ক্যাডারে সুপারিশপ্রাপ্ত হয়েছি। আমার বাবা-মা, ভাই-বোন, স্ত্রী সবার সাপোর্ট পেয়েছি। যা আমাকে বিসিএসের মতো লম্বা রেইসের প্রতিযোগিতায় টিকে থাকতে সাহায্য করেছিল। এর বাইরে আমার বিশ্ববিদ্যালয়ের ৫ জনের একটি গ্রুপ ছিল, তাদের অবদান অনস্বীকার্য।
জাগো নিউজ: নতুনরা বিসিএসের জন্য কীভাবে প্রস্তুতি নেবেন?
মো. ফারুক হোসেন: নতুনদের উদ্দেশ্যে বলতে চাই, একাডেমিক পড়াশোনার পাশাপাশি পত্রিকা পড়া, ৯ম এবং ১০ম শ্রেণির ছাত্রদের পড়ানো দরকার হলে ফ্রি পড়াবেন, তবুও পড়ানোর পরামর্শ রইলো। এর ফলাফল চাকরির পরীক্ষাগুলোতে পাবেন। বাংলাদেশে বিভিন্ন ক্যাটাগরিতে চাকরিতে নিয়োগ হয়। সে ক্ষেত্রে নিজের মেধার ওজন বা মেরিট নিজে বুঝতে পারলে রাস্তা বের করা সহজ হবে। অনেকেই বিশ্ববিদ্যালয়ের শুরু থেকেই বিসিএস প্রস্তুতি শুরু করেন। আমার মতে একাডেমিক পড়াশোনা শেষে শুরু করলেও সমস্যা নেই। তবে চাকরির জন্য যে পড়াশোনা, তা শুরু করার পর ব্রেক দিতে নেই।
জাগো নিউজ: আপনার ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা কী?
মো. ফারুক হোসেন: ভবিষ্যতে একজন ভালো মানুষ হতে চাই। পাশাপাশি ইতিবাচক কাজের মাধ্যমে স্মরণীয় হওয়ার স্বপ্ন আছে।