বিসিএসের মৌখিক পরীক্ষা ও খুঁটিনাটি অনেক বিষয় নিয়ে যুগান্তরের সঙ্গে কথা বলেছেন ৩৩তম বিসিএস পুলিশ ফোরামের সাধারণ সম্পাদক ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের সিরিয়াস ক্রাইম ইনভেস্টিগেশন বিভাগের সহকারী কমিশনার মিশু বিশ্বাস। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন জিয়াউর রহমান চৌধুরী

প্রশ্ন : সামনেই তো ৩৮তম বিসিএসের মৌখিক পরীক্ষা, প্রার্থীদের কি বলবেন?

মিশু বিশ্বাস : বিসিএসে মৌখিক পরীক্ষা অনেক বড় একটা বিষয়। তবে একেবারেই কঠিন বা ভয় পাওয়ার মতো কিছু নয়। আবারও বলছি, বড় ও গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। কারণ, প্রিলিমিনারি ও লিখিত পরীক্ষায় ভালো ফল করেও অনেকে মৌখিক পরীক্ষায় বাদ পড়ে যান। তাই বলছি, পরীক্ষাটি কিছুটা স্পর্শকাতর ও ভাগ্যের ওপর নির্ভরশীল। এখানে মেধা, যোগ্যতার সঙ্গে ভাগ্যও কিছুটা দরকার পড়ে।

প্রশ্ন : মৌখিক পরীক্ষায় কি কি বিষয়ে প্রশ্ন হতে পারে?

মিশু বিশ্বাস : বাংলাদেশ ও মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস বিষয়ে প্রশ্ন থাকে। এসব প্রশ্ন থেকে মূলত একজন প্রার্থীর মানসিক পরীক্ষা যাচাই করে নেন বোর্ডের সদস্যরা। সেক্ষেত্রে মুক্তিযুদ্ধের সঠিক ইতিহাস জানা থাকা এবং ওই সময়কার খুঁটিনাটি অনেক বিষয়ে ধারণা থাকা নিয়ে রাখতে হবে। আন্তর্জাতিক বিষয়বালী, ঘটনাবলি, সাম্প্রতিক রাজনৈতিক পরিস্থিতি এসব বিষয়ে প্রশ্ন হয়ে থাকে। পরীক্ষার্থী বিশ্ববিদ্যালয় জীবনে যে বিষয়ে পড়াশোনা করেছেন তা নিয়ে ভালোভাবে জানার চেষ্টা করেন বোর্ডের সদস্যরা। এজন্য প্রার্থী স্নাতক-স্নাতকোত্তরে যে বিষয় পড়ে এসেছেন তা নিয়ে ভালো ধারণা না থাকলে পরীক্ষা খুব বেশি ভালো হওয়ার সুযোগ নেই। এই যে ধরুন, আমি বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয় থেকে নৌযান ও নৌযন্ত্র-কৌশল বিষয়ে পড়েছি এসব বিষয় প্রশ্ন করাটা স্বাভাবিক।

প্রশ্ন : মৌখিক পরীক্ষা তো অনেকের কাছে ভীতিকর, সেক্ষেত্রে কি বলবেন?

মিশু বিশ্বাস : আগেও বলেছি অনেকে শুধু কয়েকবার মৌখিক পরীক্ষা থেকেই বাদ পড়ে যান। এটা অনেকটাই মানসিক মেধা যাচাই পরীক্ষা, সঙ্গে ভাগ্যেরও। মৌখিক পরীক্ষাকে গুরুত্ব দিতে হবে, তবে কোনোভাবেই চাপ নেয়া যাবে না। বিশ্বাস করতে হবে, আমি পারব। সেই সঙ্গে খেয়াল রাখতে হবে ভাইভা বোর্ড আপনার কাছে কি চাচ্ছে। তাৎক্ষণিকভাবে সিদ্ধান্ত নিতে হবে, কি উত্তর দেবেন। কারণ, প্রশ্নের ঠিক উত্তর না পারলেও তার কাছাকাছি কিছু জানা থাকলে তার কথা বলা কিংবা না পারাটাই স্মার্টলি উত্তর দেয়াটাই জরুরি। সেই সঙ্গে, মৌখিক পরীক্ষায় যেভাবে প্রশ্ন করা হয় ঠিক সেভাবেই উত্তর দেয়ার নিয়ম। বাংলায় প্রশ্ন করলে বাংলায়, আর ইংরেজিতে প্রশ্ন করলে ইংরেজিতে উত্তর দিতে হবে। শুরুতেই সিদ্ধান্ত নিতে হবে আপনি ভাইভা বোর্ডকে নিয়ন্ত্রণ করবেন নাকি ভাইভা বোর্ড আপনাকে। কারণ, আপনার ফলটা একেবারে শুরুতেই ঠিক হয়ে যাবে বেশিরভাগ ক্ষেত্রে। একই সঙ্গে ইংরেজিতে ভালো দক্ষতা থাকাটাও বেশি জরুরি। ভাইভা বোর্ডের সদস্যরা পোশাক, অঙ্গভঙ্গি এসব বিষয়ে খেয়াল করেন। অমার্জিত কিংবা বেশি ক্যাজুয়াল এমন পোশাক পরা বা আচরণ না করাই প্রার্থীর জন্য ভালো।

প্রশ্ন : আপনি তো বুয়েটে পড়েছেন, পুলিশিংয়ে কেন এলেন?

মিশু বিশ্বাস : আসলে ধারণাটা বদলাতে শুরু করেছে। পুলিশের চাকরিটা এখন আর মান্ধাতার সনাতন আমলের মতো নেই। অনেক চৌকস তরুণ মেধাবীরা পুলিশে চাকরি করতে আসছেন। পুলিশের সেবার মানও এখন অন্য যে কোনো সময়ের চেয়ে বেশি। এসব কারণে দিন দিন বিসিএস পুলিশ ক্যাডারের প্রতি মেধাবী তরুণদের আগ্রহ বাড়ছে। আমি পড়েছি চট্টগ্রাম কলেজিয়েট স্কুল ও নটরডেম কলেজে। পরে যখন বুয়েটে পড়তে আসলাম সেখানে আমি সরাসরি ছাত্র সংগঠন ও সেবামূলক সংগঠনের সঙ্গে যুক্ত হয়ে পড়ি। সেই থেকে মানুষের সেবা করার প্রত্যয়টা মনে বাসা বাধেঁ। আসলে পুলিশের চাকরিতে মানুষকে সরাসরি-প্রত্যক্ষ সেবা দেয়ার সুযোগ অনেক বেশি। মূলত দেশপ্রেম আর সেবার কথা চিন্তা করেই বুয়েট থেকে পড়াশোনা করে অন্য চাকরিতে না গিয়ে পুলিশে এসেছি। যার পেছনে আমার বাবা সমীরণ বিশ্বাস আর মা সুমিতা বিশ্বাসের অবদান সবচেয়ে বেশি। অনেক সমালোচনা সত্ত্বেও সবমিলিয়ে আমি পুলিশ পেশা নিয়ে সত্যি গর্ব করি।

প্রশ্ন : প্রকৌশলের শিক্ষার্থীরা বিসিএসে অংশগ্রহণের হার কেমন?

মিশু বিশ্বাস : বিসিএসে আসলে এখন পর্যন্ত কারিগরি বা প্রকৌশলবিদ্যা থেকে আসা ছেলেমেয়েদের অংশগ্রহণ অনেক কম। তবে, দিন দিন তরুণদের আগ্রহ বাড়ছে। আমি ব্যক্তিগতভাবে মেধা পাচারের বিপক্ষে। দেশের উন্নয়নের কথা চিন্তা করলে মেধা পাচার ঠেকাতে তরুণদের হয় সফল উদ্যোক্তা হিসেবে কাজ করতে হবে না হয় দেশের আর্থ-সামাজিক প্রেক্ষাপটের কথা চিন্তা করে প্রকৌশল পড়–য়া শিক্ষার্থীদের আরও বেশি করে বিসিএসে আসা উচিত। বিশেষ করে, পররাষ্ট্র, পুলিশ, প্রশাসন ও কর ক্যাডারে। নৌপ্রকৌশলে পড়ার পর আমার জন্য সবচেয়ে ভালো অফার ছিল, বিদেশে চলে যাওয়া। ভালো বেতন-সুবিধার চাকরি ছেড়েও এখানে থেকেছি। আমাদের দেখে বুয়েট-কুয়েট-চুয়েট-রুয়েটসহ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের অনেকেই এখন বিসিএসে আসতে চাইছে। আমি মনে করি, এক্ষেত্রে পুলিশ ক্যাডারকে এক নম্বরে রাখতে হবে। আধুনিক তথ্যপ্রযুক্তির বদৌলতে পুলিশিং যেমন বদলে গেছে, তেমনি সেখানে অনেক কারিগরি জ্ঞাণসম্পন্ন, মেধাবী প্রকৌশল জানা লোকজনেরও দরকার পড়ছে। সবমিলিয়ে বলব, প্রকৌশল থেকে পড়ে পুলিশিংয়ে ভালো করার সুযোগ সবচেয়ে বেশি। এ সুযোগটা কাজে লাগাতে হবে। যত বেশি মেধাবীরা বিসিএসে অংশগ্রহণ করবে তত বেশি সেবার মান বাড়বে।

News Reporter

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *